গরমকাল শুধু অস্বস্তির ঋতু নয়-এটি আমাদের শরীরের জন্য একটি বড় শারীরিক পরিবর্তন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাবে হিটওয়েবের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ বিশ্ববাসীকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ২০২৫-২৬ সালে স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স এবং গ্রিসের অনেক অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে পৌঁছেছে, যার ফলে ক্লান্তি, ডিহাইড্রেশন, ইলেকট্রোলাইট ইমব্যাল্যান্স এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়েছে।
শুধু বৃদ্ধ বা অসুস্থ মানুষ নয়-সুস্থ তরুণ-তরুণীরাও এক্সট্রিম হিটের প্রভাবে ক্লান্তি, মাথাব্যথা, অতিরিক্ত ঘাম, নিম্ন রক্তচাপ এমনকি কগনেটিভ পারফরম্যান্স কমে যাওয়ার সমস্যায় পড়ছেন।
মানবদেহ স্বাভাবিকভাবে ৩৬.৫-৩৭.৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা বজায় রাখতে কাজ করে। কিন্তু পরিবেশের তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে গেলে শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে। এই গরমে ঘামের সময় শরীর থেকে শুধু পানি নয়, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্লোরাইডের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রোলাইটসও বেরিয়ে যায়। ফলাফল হিসেবে দেখা দিতে পারে ডিহাইড্রেশন, মাসেল ক্রেম্প, দুর্বলতা, পেশিতে টান, খিটখিটে মেজাজ, গুরুতর ক্ষেত্রে হিটস্ট্রোক।
এ কারণেই গরমকালে শুধু বেশি পানি পান করুন বললেই যথেষ্ট নয়; বরং কী খাবেন, কখন খাবেন এবং কোন খাবার শরীরকে হাইড্রেট ও শীতল রাখতে সাহায্য করবে এসব জানাও জরুরি। একজন পুষ্টিবিদ হিসেবে আমি বলব, গরমে পুষ্টির ক্ষেত্রে পানিশূন্যতা রোধ, ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য, সহজে হজম এই বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখতে হবে।
আর আমাদের সবার জানা উচিত গরমকালে কী ধরনের খাবার খাওয়া প্রয়োজন?
পানি ও হাইড্রেটিং ফ্লুইড : গরমে শরীরের পানির চাহিদা বেড়ে যায়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাধারণত দৈনিক ২-৩ লিটার পানি প্রয়োজন হলেও অত্যধিক গরমে এই প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে। হাইড্রেটিং ড্রিঙ্কস যেমন- সাধারণ পানি, ডাবের পানি- প্রাকৃতিক ইলেকট্রোলাইট ড্রিঙ্ক, লেবুর শরবত (কম চিনি), ঘোল-লাচ্ছি, ফল ও সবজি ভিজানো পানি (পুদিনা, শসা, লেবু), ডাবের পানি বিশেষভাবে পটাশিয়াম সমৃদ্ধ, যা ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
পানিসমৃদ্ধ ফল : যেসব ফলে পানির পরিমাণ বেশি, সেগুলো গরমে খুব উপকারী।
উপকারী ফল : তরমুজ (৯০ থেকে ৯২ শতাংশ পানি), শসা, কমলা, পেঁপে, স্ট্রবেরি, মাস্কমেলন। এসব ফলে পানি ছাড়াও ভিটামিন সি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইবার থাকে, যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সহায়তা করে।
হালকা ও সহজপাচ্য খাবার : গরমে অতিরিক্ত তেলজাতীয় খাবার হজমে চাপ ফেলে এবং বিপাকীয় তাপ উৎপাদন বাড়ায়। বেছে নিন সহজ খাবার যেমন- ভাত-ডাল-সবজি, খিচুড়ি (হালকা), সবজি স্যুপ, গ্রিল করা মাছ/সেদ্ধ মুরগি, সালাদ, মসুর ডাল, প্রোটিন ও খনিজ পদার্থ এর ভালো উৎস।
প্রোবায়োটিক খাবার : গরমে খাদ্য বিষক্রিয়া ও হজমের অস্বস্তি বেড়ে যায়। অন্ত্রের মাইক্রোবায়োটা স্বাস্থ্যকর রাখতে প্রোবায়োটিক খাবার সাহায্য করতে পারে। এর জন্য বেছে নিতে পারেন- দই-লাচ্ছি, ফার্মেন্টেড ড্রিংকস, দইয়ে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া হজমে সহায়তা করে এবং অন্ত্রের প্রতিবন্ধকতার কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ খাবার : শুধু পানি নয়, ইলেকট্রোলাইট প্রতিস্থাপন ও জরুরি। ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ খাবার যেমন- কলা (পটাশিয়াম), পালংশাক, ডাবের পানি, কমলা, টমেটো ইত্যাদি। পটাশিয়াম পেশির কার্যকারিতা এবং তরল ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
গরমকালে যেসব খাবার কম খাওয়া ভালো-
অতিরিক্ত ভাজাপোড়াজাতীয় খাবার, ঝাল খাবার, সফট ড্রিংকস, ক্যাফেইন, প্রসেস ফাস্টফুড। সফট ড্রিংকসে থাকা অতিরিক্ত চিনি সাময়িক এনার্জি দিলেও তা ডিহাইড্রেশন বাড়াতে পারে।
গরমকাল আমাদের শরীরের সহনশীলতার একটি পরীক্ষা। বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু সংকট বিশেষ করে ইউরোপের তাপপ্রবাহ আমাদের শিখিয়েছে যে সঠিক পুষ্টি এবং হাইড্রেশন এখন বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। এই গরমে হালকা খাবার খান, পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করুন এবং শরীরকে গরম থেকে রক্ষা করুন।
লেখক : পুষ্টিবিদ
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আরবিএন