সরকারি বরাদ্দ ছিল ড্রেনেজ খাল খননের জন্য। কিন্তু সেই খালের পরিবর্তে খনন করা হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংরক্ষিত সেচ খাল। অভিযোগ উঠেছে, কোনো নকশা ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে পুরো কাজ। অতি দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের প্রকল্প হলেও অধিকাংশ মাটি কাটা হয়েছে ভেকু দিয়ে।
খননের সময় কেটে ফেলা হয়েছে খালপাড়ের অসংখ্য ফলদ ও বনজ গাছ। পরে খালের ভেতরের পাড়েই রোপণ করা হয়েছে শত শত গাছের চারা। এতে প্রায় ১ হাজার ৬ হেক্টর কৃষিজমির সেচব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন, খাল খনন নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্তে কর্মসংস্থান প্রকল্প বাস্তবায়ন কিংবা খননকাজে অনিয়মের প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বলেন, সেচ খালের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ডিজাইন অনুসরণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো ডিজাইন চাওয়া হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় ডি-১২ এক্সকে ড্রেনেজ খালের ৪ দশমিক ৯৩ কিলোমিটার খননের জন্য ১ কোটি ২৬ লাখ ৯৮ হাজার ২৯৮ টাকা এবং ১-ডি-১১-এন ড্রেনেজ খালের ১ দশমিক ৩১ কিলোমিটার খননের জন্য ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৩৫০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
প্রকল্পের শর্ত ছিল উপকারভোগী শ্রমিক নিয়োগ, পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদনে সহায়তা নিশ্চিত করা। কিন্তু অভিযোগ পাওয়া গেছে, অনুমোদিত ১-ডি-১১-এন ড্রেনেজ খালের কাজ না করে শিতলী ও পায়রাডাঙ্গা এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংরক্ষিত টার্শিয়ারি সেচ খাল প্রায় ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার খনন করা হয়। অথচ অনুমোদিত ড্রেনেজ খালের কাজ এখনও শুরুই হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, টার্শিয়ারি সেচ খাল ইচ্ছামতো খনন করা যায় না। নির্ধারিত প্রকৌশল নকশা অনুসারে কেবল পুনঃআকৃতি করা যায় এবং সেটিও বোর্ডের তত্ত্বাবধানে। সমালোচনার মুখে কাজ শেষ হওয়ার পর সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী সেচ খালের তলদেশ থেকে মাত্র ছয় ইঞ্চি মাটি অপসারণ করে পাড়ে ফেলতে হয় যাতে জমির তুলনায় খাল অতিরিক্ত গভীর না হয়ে পড়ে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয়নি।
কোথাও খাল অতি গভীর, কোথাও উঁচু-নিচু হয়ে গেছে। ফলে সেচের পানি পাশের জমিতে উঠার পরিবর্তে খালের মধ্যেই আটকে থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, নিয়ম অনুযায়ী খালের বাইরের পাড়ে গাছ লাগানোর কথা থাকলেও এখানে শত শত গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে ভেতরের পাড়ে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, এসব গাছ বড় হলে সেচের পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য হলেও অধিকাংশ মাটি কাটা হয়েছে ভেকু দিয়ে। শ্রমিকদের দিয়ে কেবল সামান্য অংশের মাটি সমান করা হয়েছে। কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এলে শ্রমিক উপস্থিত দেখান হলেও অন্য সময় চলেছে মেশিন।
শিতলী গ্রামের কৃষক বানাত আলী বলেন, এভাবে খাল কাটলে মাঠে পানি পৌঁছাবে না। কৃষক ওহিদুল ইসলাম বলেন, জমির চেয়ে খাল বেশি গভীর হয়ে গেছে। কৃষক রফি উদ্দিন বলেন, এটি খাল সংস্কার নয়, কৃষকদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করা হয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি