ভয়াবহ দাবানলে পুড়ে ছারখার ফ্রান্সের বিস্তৃত এলাকা। পরিস্থিতি ভয়াবহ। এরই মধ্যে পুড়ে গেছে হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা। এখনও পুড়ছে। হাজার হাজার মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। কোনো যুদ্ধ ছাড়া ফ্রান্সের ইতিহাসে প্রথমবার এত মানুষকে আবাসস্থল ছেড়ে পালাতে হলো।
দেশটির আটলান্টিক উপকূলের পর্যটন এলাকা থেকে মঙ্গলবার আরও প্রায় চার হাজার মানুষকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। নতুন করে ফিরে এসেছে দাবদাহ। আর তাতে বোর্দো শহরের পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়া এক বিশাল দাবানলের বিরুদ্ধে দমকল কর্মীরা প্রাণপন লড়াই করছেন।
বার্তাসংস্থা এপি জানায়, নতুন দাবানল দমকলকর্মীদের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে। জিরোন্দ অঞ্চলের এই আগুন প্যারিস শহরের আয়তনের চারগুণ এলাকা পুড়িয়ে ছারখার করেছে। এর ফলে ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।
ফ্রান্স ও স্পেনজুড়ে নজিরবিহীন মাত্রার এসব দাবানলের কারণে বাড়িঘর ও অবকাশ যাপন কেন্দ্র ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ। স্পেনেও চলতি গ্রীষ্মের চতুর্থ দাবদাহ চলছে। সেখানেও সবচেয়ে বড় দাবানলসহ বেশ কয়েকটি দাবানল এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে।
বার্তাসংস্থা এপি কোনো যুদ্ধ সংঘাত ছাড়াই ফ্রান্সে এমন বিশাল পরিসরে এর আগে কখনো মানুষ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেনি বলে উল্লেখ করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা লরঁ নুনেজ জানিয়েছেন, যুদ্ধকালীন সময় ছাড়া এটি সম্ভবত দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বেসামরিক লোকবল অপসারণ অভিযান।
অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা জিরোন্দ অঞ্চলের আগুন আপাতত নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। উপকূলীয় বালিয়াড়ির কাছের ছোটখাটো আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছেন। তাদের অক্লান্ত চেষ্টায় পুড়ে যাওয়া এলাকার পরিমাণ ৪২০ বর্গকিলোমিটারে (১৬২ বর্গমাইল) অপরিবর্তিত রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
তবে কর্তৃপক্ষ আগুনকে পুরোপুরি নিভে গেছে না বলে বরং স্থিতিশীল বলে অভিহিত করেছে। অর্থাৎ সাময়িকভাবে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও আর্দ্রতা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে যা যেকোনো মুহূর্তে আবারও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে। জিরোন্দ আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লাকানো রিসোর্টের আশপাশের ক্যাম্পসাইট, হলিডে ভিলেজ, পর্যটক আবাসস্থল এবং বিনোদন পার্কগুলোকে এই সতর্কতামূলক উচ্ছেদ নির্দেশের আওতায় আনা হয়েছে।
ফ্রান্সের জাতীয় অগ্নিনির্বাপক ফেডারেশনের মুখপাত্র এরিক ব্রোকার্দি মঙ্গলবার বিএফএমটিভিকে বলেছেন, আমরা ভয়াবহ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে আছি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও আমরা এই আগুন নেভানোর লড়াই চালিয়ে যাব। কাছেই বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া এবং কর্তৃপক্ষ পর্যটকদের দূরে থাকার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও কিছু অবকাশ যাপনকারী ফরাসি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, গ্রীষ্মকালীন ভাড়ার জন্য ব্যয় করা হাজার হাজার ইউরো এবং ট্রেনের টিকেটের অর্থ হারানোর ভয়ে তারা ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া যায় কি না তা এখনও ভেবে দেখছেন।
ফ্রান্সের জাতীয় আবহাওয়া অফিস মঙ্গলবার দুপুর থেকে জিরোন্দ অঞ্চলকে হলুদ তাপ (উচ্চ মধ্যবর্তী) সতর্কতার আওতাভুক্ত করেছে। ৩৩ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৯১ থেকে ৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। পুরো অঞ্চলজুড়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বাতাসের পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে পশ্চিম দিক থেকে সমুদ্রের মৃদু বাতাস বইবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ফ্রান্সজুড়ে ১ হাজার ১৬০ বর্গকিলোমিটারের (৪৪৮ বর্গমাইল) বেশি এলাকা পুড়ে গেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস ক্লাইমেট সার্ভিসের মতে, ইউরোপ বিশ্বের দ্রুততম গরম হতে থাকা মহাদেশ। এটি বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি মাত্রায় উষ্ণ হচ্ছে। কোপারনিকাস জানিয়েছে, পশ্চিম ইউরোপে সর্বকালের উষ্ণতম জুন মাস রেকর্ড করা হয়েছে আর চরম তাপ ও ব্যাপক শুষ্কতা ফ্রান্স ও স্পেনে দাবানল ছড়িয়ে পড়তে এবং তীব্র আকার ধারণ করতে ভূমিকা রেখেছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি