মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে মরণনেশা মাদকের বিস্তার। পৌর এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত ইউনিয়ন পর্যন্ত গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা ট্যাবলেট।
হাতের নাগালে মাদক পেয়ে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্ম আসক্ত হয়ে পড়ছে। আর নেশার টাকা জোগাড় করতে উপজেলায় জ্যামিতিক হারে বাড়ছে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মাদক কারবারিরা কৌশল পাল্টেছে। এখন রিকশা চালক, হকার ও দিনমজুরদের একটি অংশ ইয়াবা বহনের মূল চালিকাশক্তি।
রিকশায় যাত্রী বহনের আড়ালে, কিংবা রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পণ্য বিক্রির অজুহাতে খুব সহজেই ক্রেতাদের কাছে ইয়াবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। দিনমজুরের বেশে থাকায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও সহজে এদের সন্দেহ করতে পারছে না।
শুধু শ্রমজীবী নয়, বিভিন্ন বৈধ ব্যবসার আড়ালেও চলছে নিষিদ্ধ মাদক বাণিজ্য। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মোড়ের পানের দোকান, মুদি দোকান, চায়ের স্টল, মোবাইল রিচার্জের দোকান এমনকি সেলুনের আড়ালেও চলছে ইয়াবার খুচরা কেনাবেচা।
প্রতিটি ইউনিয়নে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ডিলাররা এসব দোকানকে ‘সেফ জোন’ হিসেবে ব্যবহার করছে। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ব্যবসা মনে হলেও পর্দার আড়ালে সেখানে দিন-রাত চলছে লাখ লাখ টাকার ইয়াবা বাণিজ্য।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কমলগঞ্জ পৌরসভার ১০নং রোড, উপজেলা ভূমি অফিসের পাশে, উপজেলা চৌমুহনী, ভানুগাছ চৌমুহনীর সম্মুখ এবং ৯টি ইউনিয়ন রহিমপুর, পতনঊষার, মুন্সিবাজার, শমশেরনগর, কমলগঞ্জ সদর, আলীনগর, আদমপুর, মাধবপুর ও ইসলামপুরের প্রতিটি গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায় ছোট ছোট ইয়াবা ডিলার তৈরি হয়েছে।
চা-বাগান বেষ্টিত সীমান্ত এলাকা হওয়ায় খুব সহজেই ইয়াবার বড় চালান উপজেলায় প্রবেশ করছে এবং পরে তা খুচরা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
মাদক বিপণনে এখন সরাসরি লেনদেন হচ্ছে না। মুঠোফোনে যোগাযোগের পর বিকাশ, রকেট, নগদের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করা হয়। এরপর কোড নামের মাধ্যমে পানের দোকান, চা-বাগানের নির্জন কোণ, রেললাইনের পাশ কিংবা কালভার্টের নিচে ইয়াবা লুকিয়ে রেখে ক্রেতাকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এতে মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইয়াবার সহজলভ্যতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আইনশৃঙ্খলার ওপর। মাদকাসক্তদের বড় অংশই বেকার তরুণ ও শিক্ষার্থী। প্রতিদিন নেশার টাকা জোগাড় করতে তারা জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনদুপুরে ও রাতের আঁধারে বাড়ছে চুরি ও ছিনতাই। বাসাবাড়ির পানির পাম্প, গবাদিপশু, মোবাইল ফোন, বাইসাইকেল থেকে শুরু করে ঘরের আসবাবপত্র ও নগদ টাকা চুরি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এমনকি বাজার ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতেও চোরের উপদ্রব বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইয়াবা ব্যবসায়ী দাবি করেন, যারাই এ ব্যবসা করছে তারা কমলগঞ্জ থানা পুলিশের সদস্যদের ম্যানেজ করেই করছেন।
স্থানীয়রাও অভিযোগ করেন, পুলিশকে তথ্য দিলেই মাদক ব্যবসায়ীরা জেনে যায় এবং পরে তথ্যদাতারা হয়রানির শিকার হন।
এ বিষয়ে কমলগঞ্জ থানার ওসি কমর উদ্দিন বলেন, পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইতিমধ্যে দুটি মাদক মামলা দায়ের ও দুটি ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
থানা পুলিশের ম্যানেজের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমরা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি।
স্থানীয়রা মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তার রোধে প্রশাসনের জোরালো অভিযান ও কঠোর ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ।
সময়ের আলো/আতা