কোটি কোটি টাকার ভৌত অবকাঠামো এবং সরকারি বিশাল বিনিয়োগ সত্ত্বেও লক্ষ্মীপুরের উপকূলীয় দুই উপজেলা কমলনগর ও রামগতির প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চরম সংকটের মুখে পড়েছে। শিক্ষকদের নিয়মিত অনুপস্থিতি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর তদারকির অভাবে এখানকার প্রাথমিক শিক্ষার বুনিয়াদ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপকূলীয় এই দুই উপজেলার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। অনেক শিক্ষক সকালে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেই ব্যক্তিগত কাজে বাইরে চলে যান। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের কোন্দল, নিয়মিত বিজ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষার ক্লাস না হওয়া এবং প্রধান শিক্ষক ছুটিতে থাকলে নির্দিষ্ট বিষয়ের পাঠদান পুরোপুরি বন্ধ থাকার মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। এর ওপর অধিকাংশ বিদ্যালয়ে নেই কোনো খেলার মাঠ। নদীভাঙন কবলিত ও দরিদ্র উপকূলীয় এলাকার অভিভাবকরা পেশায় দিনমজুর হওয়ায় সন্তানদের পড়াশোনার খোঁজখবর রাখতে পারেন না, যা শিক্ষার এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কমলনগরের ৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে মোট শিক্ষক রয়েছেন ৪৪১ জন (পুরুষ ১৯৪, নারী ২৪৭)। বিশাল অবকাঠামো ও বিপুলসংখ্যক শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও মোট শিক্ষার্থী মাত্র ৬,৪৯৮ জন (বালক ৫,৫৭৩ ও বালিকা ১,২০৭১)। উপজেলার দক্ষিণ-পূর্ব চর জগবন্ধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র ৬০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন ৭ জন।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার শিক্ষকদের বসে বসে বেতন দিচ্ছে, কিন্তু স্কুলে লেখাপড়া কিছুই হচ্ছে না।
অন্যদিকে, একই সীমানার (বাউন্ডারি) ভেতরে ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘চর লরেন্স সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ (১৩২ জন শিক্ষার্থী, ৪ জন শিক্ষক) এবং ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘চর লরেন্স শহিদ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ (১৫৪ জন শিক্ষার্থী, ৫ জন শিক্ষক) পরিচালিত হওয়ায় চরম প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং সরকারি সম্পদের অপচয় ঘটছে।
একইভাবে রামগতি উপজেলার ৯৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৭,৪২৬ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন ৫৯৮ জন (পুরুষ ২১২, নারী ৩৮৬)। পর্যাপ্ত জনবল থাকা সত্ত্বেও দুর্গম চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে ভৌগোলিক দূরত্বের অজুহাতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের তদারকি নেই বললেই চলে।
শিক্ষার মান রক্ষা ও অনিয়ম নিরসনের বিষয়ে জানতে চাইলে কমলনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা প্রান্তিক সাহা বলেন, আমরা অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। কোনো শিক্ষক যেন স্কুল ফাঁকি দিতে না পারেন, সে জন্য অনলাইনে হাজিরার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অনুপস্থিত থাকলে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দ্রুতই শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে। আর ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়টি জাতীয় সিদ্ধান্ত সাপেক্ষ।
অন্যদিকে রামগতি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মু. সাইদুর রহমান স্বপন জানান, ইনশাআল্লাহ আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে স্কুলে কোনো সমস্যা দেখতে পাচ্ছি না, যদি থাকে তা দুঃখজনক। বিষয়গুলো পরবর্তীতে দেখা যাবে। এখন স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতি আগের চেয়ে বেশি।
তবে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের এসব আশ্বাসে মোটেই আশ্বস্ত হতে পারছেন না স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকরা। উপকূলীয় চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় অনতিবিলম্বে শিক্ষা অফিসের ঝটিকা পরিদর্শন, ফাঁকিবাজ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর জন্য জোরালো দাবি জানিয়েছেন তারা।
সময়ের আলো/জোই