২৮ ইঞ্চি উচ্চতার মিলির স্বপ্ন একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই

বাগেরহাট প্রতিনিধি

সারাদেশ

মিলি, বয়স তার ৩৪ বছর হলেও শারীরিক গড়ন ছোট্ট শিশুর মতো। জীবনের এতোগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও তার শরীরের উচ্চতা আর

2026-07-31T16:35:35+00:00
2026-07-31T16:35:35+00:00
 
  রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৫ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
২৮ ইঞ্চি উচ্চতার মিলির স্বপ্ন একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই
বাগেরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ৪:৩৫ পিএম 
মিলি। ছবি : সময়ের আলো
মিলি, বয়স তার ৩৪ বছর হলেও শারীরিক গড়ন ছোট্ট শিশুর মতো। জীবনের এতোগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও তার শরীরের উচ্চতা আর বাড়েনি। এ বয়সেও তার উচ্চতা মাত্র ২৮ ইঞ্চি। অথচ তার স্বপ্নগুলো থেমে নেই। একটি সুন্দর ঘর হবে, সেই ঘরের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠবেন। তার একটি গরু, একটি ছাগল আর একটি থাকার ঘর হবে। এমন স্বপ্নও দেখেন মিলি।

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের গুলিশাখালী গ্রামের মিলি আক্তারের পিতা নজরুল ইসলাম। মিলির পরিবারের দাবী, হরমোনজনিত জটিলতার কারণে জন্মের পর থেকে মিলির শারীরিক উচ্চতা স্বাভাবিকভাবে বাড়েনি। ১৯৯২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া মিলির বয়স এখন ৩৪ বছর। অথচ তার উচ্চতা মাত্র ২৮ ইঞ্চি অর্থাৎ ২ ফুট ৪ ইঞ্চি।

মিলির জন্মের আগেই তার মাকে ছেড়ে চলে যায় বাবা নজরুল ইসলাম। তারপর আর ফিরে আসেননি। দুই বছর বয়সে মিলিকে নানা-নানির কাছে রেখে জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে পাড়ি জমান মা ফরিদা ইয়াসমিন। দীর্ঘ ২৭ বছর পর দেশে ফিরে তিনি দেখেন, মেয়ের বয়স বেড়েছে, কিন্তু বাড়েনি তার উচ্চতা। ছোট্ট শরীরের এই মানুষটির বড় কোনো চাওয়া নেই। দামী খেলনা নয়, বিলাসী জীবন নয়। তার চাওয়া একটি ঘর, একটি গরু আর একটি ছাগল। এই সামান্য চাওয়াগুলোই যেন তার কাছে বিশাল এক পাওনা। কিন্তু তার এ স্বপ্ন আর চাওয়া কোনদিন পূর্ণতা পাবে কিনা জানেনা।

মায়ের ফিরে আসার পর মিলির ছোট্ট পৃথিবীটা আবার যেন একটু পূর্ণতা পায়। কিন্তু জীবন তখনও সহজ হয়নি। সংসারে অভাব, মায়ের অসুস্থতা, ভাইয়ের পড়াশোনা সব মিলিয়ে প্রতিদিনই সংসার চলে টানাপোড়েন। মিলি নিজের দৈনন্দিন কাজগুলো নিজেই করার চেষ্টা করেন। রাত ১১টার দিকে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে ঘুমাতে যান। সকালে উঠে নিজেই দাঁত ব্রাশ করেন, গোসল করেন। দিনের বেশির ভাগ সময় ছোট ভাইয়ের আশপাশেই থাকেন। বৃদ্ধ ও অসুস্থ মায়ের প্রতি তারও মায়া আছে। সময়-অসময়ে মাকে বিরক্ত করেন না। তবে নিজের পছন্দের কিছু না হলে কিংবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু ঘটলে অভিমান করেন, কখনো রেগেও যান।


মিলিরও আছে পছন্দ-অপছন্দ, আনন্দ-বিনোদন এখনো শৈশবের মতো।  মুঠোফোনে গেম খেলতে ভালোবাসেন, গান শুনতে পছন্দ করেন, সুযোগ পেলে নাচেনও। মাছ-মাংস, পিঠা, আপেল আর কমলা তার প্রিয় খাবার। পরিবারের সামর্থ্য নেই মিলিকে দামী খেলনা কেনার। তাই কখনো জুসের খালি বোতলই হয়ে ওঠে মিলির খেলার সঙ্গী।  মাঝেমধ্যে সে মাকে প্রশ্ন আমাদের ঘরটা এত ছোট কেন? দোতলা ঘর হবে কবে? আমি সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠব।

মিলির মা ফরিদা ইয়াসমিনের জীবনও সংগ্রামে ভরা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, মিলিকে গর্ভে রেখে আর সাড়ে তিন বছরের বড় মেয়ে পলি আক্তারকে রেখে ওর বাবা চলে যায়। আজ পর্যন্ত ফিরে আসেনি। অনেক কষ্ট করে বড় মেয়েকে লেখাপড়া করিয়েছি, বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু মিলিকে জন্মের পর ভালো চিকিৎসা কিংবা পুষ্টিকর খাবার দিতে পারিনি।

জীবনের প্রয়োজনে  আবার বিয়ে করেন ফরিদা ইয়াসমিন। দুই মেয়েকে নিয়ে চলে যান সিলেটের গোয়াইনঘাটা উপজেলায় বর্তমান স্বামীর বাড়িতে। কিন্তু সেখানেও স্থায়ীভাবে বসবাস করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত আবারো ফিরে আসেন নিজের জন্মভূমিতে।

বর্তমানে ৪২ শতক জমির ওপর বসতভিটাটুকুই পরিবারটির একমাত্র সম্বল। ফরিদা ইয়াসমিনের দ্বিতীয় স্বামী দিন মজুর সংসারে কলেজ পড়ুয়া এক ছেলে রয়েছে। অর্থের অভাবে তার পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে অসুস্থ বৃদ্ধ মা, অন্যদিকে শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মেয়ের ভবিষ্যৎ সব মিলিয়ে জীবনের প্রতিটি দিনই যেন নতুন এক সংগ্রাম।


ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, সরকারি সাহায্য বলতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধী কার্ডই আমাদের একমাত্র ভরসা। মেয়ের গরু আর ছাগল পালনের শখ এখনো পূরণ করতে পারিনি। আমরা প্রত্যন্ত  গ্রামে থাকি। কোথায় গেলে কী ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যায়, সেটাও জানি না। কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভারী হয়ে আসে মায়ের কণ্ঠ। নিজের জন্য নয়, মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েই তার যত দুশ্চিন্তা। আমি বেঁচে থাকতে মেয়ের জন্য তিনবেলা দুমুঠো খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে যেতে পারলেই শান্তি পেতাম।

উপজেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা কায়কোবাদ আকুঞ্জী বলেন, মিলির চলাচলে অসুবিধা হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়াও জাতীয় প্রতিবন্ধি উন্নয়ন ফাউন্ডেশন থেকে যদি কোন আর্থিক সহযোগিতা আসে সেটা আমরা দেয়ার চেষ্টা করবো।
  
এ বিষয়ে মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, মিলি বর্তমানে প্রতিবন্ধী হিসেবে ভাতা পাচ্ছে। এ ছাড়াও উপজেলায় সরকারী যে সকল সুযোগ সুবিধা আছে তার আওতায় মিলিকে আনা হবে।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   মিলি  স্বপ্ন  মাথা গোঁজার ঠাঁই  বাগেরহাট  মোরেলগঞ্জ  প্রতিবন্ধকতা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: