বাকপ্রতিবন্ধী শান্তনা খাতুন। কথা না বলতে পারলেও ইশারা-ইঙ্গিতে বোঝালেন, সরকার থেকে দেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন তাদের থাকার জায়গা নেই। প্রতিবেশীর সহায়তা নিয়ে শান্তনা বেগম জানান, ২০২২ সালে সরকারের দেওয়া একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পেয়েছিলেন তার বাবা। সেখানে তিনি মা-বাবা আর বোনসহ থেকেছেন প্রায় ৪ বছর। কিন্তু এ বছর আর থাকতে পারলেন না সেই ঘরে। ব্রহ্মপুত্রের করাল গ্রাসে তিনি ও তার পরিবার এখন ভিটেমাটি ছাড়া। এখন তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে।
জাহিনুর বেগম, এই গ্রামেই ছিল তার নিজস্ব ৬ শতক জমি। ধার-দেনা করে স্বামী-সন্তান নিয়ে তিনি গড়েছিলেন নিজ বাড়ি। তবে সেই ঘর আর স্থায়ী হয়নি। নদীভাঙনের কবলে ভিটেমাটি হারিয়ে এখন আছেন তিনি অন্যের জায়গায় ছোট্ট একটি ঘর তুলে।
ভাঙনে ভিটেমাটি হারানো, অন্যের বাড়িতে আশ্রয় কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা শুধু এই দুই পরিবারেরই গল্প নয়। এমন ভাঙনের গল্প কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চর কড়াই বরিশালের বিশালপাড়া গ্রামের। এলাকাবাসীর দাবি শুধু এই গ্রামে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় ৫০টি বাড়ি ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে বিলীন হয়েছে। আর ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে আরও ২০টি বাড়ি। প্রতিনিয়ত এই চরে ভাঙনের ভয়ালরূপ দেখাচ্ছে সর্বনাশা ব্রহ্মপুত্র। ভাঙনের ঝুঁকিতে এখনও প্রায় ২০০ পরিবার।
রোজিনা আক্তারের ভাঙনের গল্পটা একটু ভিন্ন। প্রথমে ভেঙেছে তার সংসার পরে ভেঙেছে তার বাড়ি। ২০২২ সালে বিয়ে হওয়ার পর নানা কারণে তার সংসার ভেঙেছে। সেই থেকেই তিনি তার বাবার সঙ্গে থাকছেন আশ্রয়ণের ঘরে। তবে সে সুখ আর বেশি দিন স্থায়ী হলো না। এবারের নদীভাঙনের কবলে গেল তাদের আশ্রয়ণের ঘর। পরিবারসহ তারাও আশ্রয় নিলেন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে।
সরেজমিন দেখা যায়, নদীভাঙনে বিপর্যস্ত কড়াই বরিশাল চর। এই চরে যে আশ্রয়ণের ঘর ছিল তা এখন দেখে বোঝার উপায় নেই। ভেঙে নিয়ে যাওয়া ঘরের আঙিনায় গল্প করতে বসেছেন রাশেদা, নুর নাহার, স্বপ্না বেগম, ফতেমা বানু। তাদের ঘর ছিল সেখানেই। এখন যা শুধুই স্মৃতির আঙিনা। সেখানে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তাদের।
ভিটেমাটি হারানো নুর নাহার বলেন, ‘৩ লাখ টাকা দিয়া জমি কিনছি। বাড়ি করতে খরচ গেছে আরও ২ লাখ। এখন সব গেল, আমরা কই যাব। আমাগো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।’ একই বক্তব্য শাহীদা খাতুনেরও। তারও ২ কাঠা জমিসহ বাড়ি তলিয়ে গেছে নদীগর্ভে। সবার মুখে এক কথা আমরা যাব কই? আমাদের যাওয়ার জায়গা নেই।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানালেন, চরে স্থায়ী নদীরক্ষা প্রকল্পের জন্য তাদের কোনো বরাদ্দ নেই। তবে জরুরি ভিত্তিতে দেড় হাজার জিওব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো ডাম্পিংয়ের কাজ চলমান। তবে সরেজমিন ভাঙনকবলিত এলাকায় জিওব্যাগ ফেলতে দেখা যায়নি।
এদিকে পাউবোর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানিয়েছে, জেলার সবকটি নদ-নদীর পানি বাড়ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরও পানি বাড়তে পারে ও নিম্নাঞ্চলে অস্থায়ী বন্যা হতে পারে। ইতিমধ্যে ধরলা ও দুধকমার নদের পানি বিপদসীমার কাছাকাছি চলে গেছে। আর পাউবো বলছে, জেলায় এখন ৩৮টি পয়েন্টে নদীভাঙন চলছে। যেখানেই নদীভাঙনের খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
সময়ের আলো/আরবিএন/প্রিন্ট