দেশে অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ। কোনোভাবেই লাগাম টানা যাচ্ছে না ভয়াবহ এই অপরাধের। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত তিন শতাধিক ধর্ষণ হয়েছে। এর মধ্যে ৯২টি ছিল সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বা গ্যাংরেপ। ধর্ষণের শিকারদের বড় একটি অংশ শিশু। এদিকে ধর্ষণের পর অন্তত ৩৩ জনকে খুন করা হয়েছে। পাশাপাশি ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন একাধিক নারী।
শুধু ধর্ষণ নয়, সময়ের সঙ্গে গ্যাংরেপও যেন ভয়ংকর প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন- ছয় মাসে দেশে ৩১৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ছয় বছর কিংবা তার কম বয়সি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৫টি।
এ ছাড়া ৭ থেকে ১২ বছর বয়সি ভিকটিম রয়েছে ৬৮ জন। পরবর্তী সময়ে ধর্ষণের এসব ঘটনায় ২৪৯টি মামলা হয়েছে। তবে বাকি ঘটনাগুলোর আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
একই সময়ে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ১২২টি। এর মধ্যে শিশু রয়েছে ২৭ জন। ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তিনজনকে খুন করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৭৮টি মামলা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ধর্ষণের পর সামাজিক হীনম্মন্যতায় দুই নারীর আত্মহত্যার তথ্য পাওয়া গেছে।
নারী নির্যাতনের চিত্রও ভয়াবহ : শুধু ধর্ষণ নয়, নির্যাতনের মাধ্যমে নারীদের হত্যার চিত্রেও ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। ছয় মাসে মোট ২৩৭ জন নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শুধু স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ৭১ জন নারী। একই সঙ্গে স্বামীর পরিবার কিংবা নিজের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও কম নয়।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে ২১ জন এবং নিজের পরিবারের সদস্যদের হাতে ৩০ জন খুন হয়েছেন। তবে এসব খুনের ঘটনায় অর্ধেকসংখ্যক মামলা করা হয়েছে।
এ ছাড়া একই সময়ে বিভিন্ন কারণে ৬৭ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে। যৌতুকের জন্য নির্যাতন ও হত্যার শিকারও হয়েছেন অনেক নারী। প্রতিবেদনে দেখা যায়, যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতনের পর ১৪ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন তিনজন।
যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করেও খুন : ভয়ংকর বিষয় হলো, যৌন হয়রানির ঘটনায় প্রতিবাদ করতে গিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যরাও খুন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে ছয়জন পুরুষকে হত্যার খবর পাওয়া গেছে।
একই প্রতিবেদনে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার চিত্রও উঠে এসেছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১৯৫ জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের পর ৫১ জন, গৃহপরিসরে নির্যাতনের পর ৪০ জন এবং নিখোঁজ হওয়ার পর ৩০ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
স্টকিং বা অনুসরণ করে যৌন হয়রানির ঘটনাও উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ছয় মাসে এ ধরনের ১২৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭৩ জন হামলার শিকার হয়েছেন এবং ৪৩ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া দুজন আত্মহত্যা করেছেন এবং যৌন হয়রানির পর দুজন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া ২৮ জন শিক্ষার্থী শিক্ষকের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ছেলেশিশু বলাৎকারের ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি।
গত বছর ৭ হাজার ৬৮টি ধর্ষণ মামলা
এদিকে গত বছর সারা দেশে ৭ হাজার ৬৮টি ধর্ষণ মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে। ওই বছর ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছিল।
অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অপরাধের তুলনায় সাজা হওয়ার হার অত্যন্ত নগণ্য হওয়ায় পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা কমাতে শুধু আইন থাকলেই হবে না; আইন প্রয়োগ, ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারপ্রক্রিয়া, সাক্ষী সুরক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতাÍসব ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে এমন অপরাধ কমিয়ে আনা কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, দেশে ধর্ষণের বিচারের আয়োজন আছে, কিন্তু সমস্যা বাধে প্রয়োগ কিংবা বাস্তবায়ন সূচকে। এ ছাড়া দেশের সব নারী নির্যাতনের ঘটনায় এক রকম বিচারের চিত্র নেই। যেসব ঘটনা অধিক প্রচার পেয়ে যায় বা ভিকটিম প্রভাবশালী হন, সেগুলোর হয়তো দ্রুত বিচার হয়। কিন্তু বাকি ঘটনাগুলোর বিচারে দীর্ঘসূত্রতা হয়। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক কোনো ঘটনায় পুলিশকে বাদী হয়ে মামলা করতে দেখা যায়। কিন্তু ধর্ষণ কিংবা নারী নির্যাতনের ঘটনায় পুলিশকে এগিয়ে এসে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। এই দৃষ্টিগত ভিন্নতার পরিবর্তন দরকার। এ ছাড়া অনেক সময় ধর্ষক প্রভাবশালী হয় এবং তার পুলিশ কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসূত্র থাকার অভিযোগ থাকে। ফলে ঘটনার বিচার পান না ভুক্তভোগী।
তিনি আরও বলেন, ধর্ষককে চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই বিচারের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় ওই ব্যক্তি আবারও একই অপরাধ করার সাহস পায়। মূলত রাষ্ট্রকে বিষয়টি ছোট করে দেখা যাবে না। সবার জন্য সমান বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।
সময়ের আলো/এসএকে