দেড় বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আট বছর পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নতুন ভবন। প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৯ তলা এই আধুনিক ভবন উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পার হতে চললেও লিফট স্থাপন না হওয়া, প্রয়োজনীয় জনবল সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার কয়েক লাখ মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা খরচ করে সুউচ্চ ভবন তৈরি করা হলেও সেবার মান ও পরিধি এক বিন্দুও বাড়েনি। জটিল রোগ তো বটেই, অনেক সময় সামান্য চিকিৎসার জন্যও রোগীদের বাধ্য হয়ে বরিশাল কিংবা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৩ সালে মাত্র ৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা ঝালকাঠি সদর হাসপাতালটি ২০০৩ সালে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এরপর ২০১৮ সালে প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করতে ৯ তলা নতুন ভবন নির্মাণের মেগা প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বারবার মেয়াদ বাড়িয়ে নানা জটিলতার জন্ম দেওয়া হয়।
নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও ২০২৩ সালের অক্টোবরে তড়িঘড়ি করে নতুন ভবনের উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন না হওয়ায় এবং লিফট স্থাপনের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় ভবনটি আজও চালু করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
এদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বলছেন, কার্যাদেশ অনুযায়ী তাদের নির্মাণকাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। একাধিকবার ভবনটি বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করেনি। ফলে ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ প্রতি মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে।
চিকিৎসা নিতে আসা পৌর শহরের বাসিন্দা কলি আক্তার বলেন, নতুন বড় ভবন দেখে ভেবেছিলাম সব ধরনের চিকিৎসা এখন এখানেই পাব। কিন্তু এসে দেখি আগের মতোই প্রচণ্ড ভিড়, জায়গার সংকট আর সাধারণ পরীক্ষার জন্যও বাইরে দৌড়াতে হচ্ছে।
রোগীর স্বজন মো. সোহেল হোসেন ও নলছিটি উপজেলার ফাতেমা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশাল ভবন বানাল, অথচ মানুষ ন্যূনতম সেবা পাচ্ছে না। দ্রুত চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করে ২৫০ শয্যার কার্যক্রম চালুর দাবি জানান তারা।
ঝালকাঠি সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সত্যবান সেনগুপ্ত গোপাল বলেন, এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি সরকারি হাসপাতাল ভবন বছরের পর বছর বন্ধ থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত না করায় জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দ্রুত লিফট স্থাপন ও চিকিৎসক নিয়োগ করে পূর্ণাঙ্গ সেবা চালুর দাবি জানাচ্ছি।
ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাসুম ইফতেখার জানান, নতুন ভবনের তিনটি তলায় জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও প্যাথলজি বিভাগের কার্যক্রম চালুর জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেছে। বিদ্যমান জনবল দিয়েই দ্রুত এসব সেবা চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, জেলা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমান উল্লাহ সরকার বলেন, লিফট স্থাপনের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা যায়নি। আগামী নভেম্বরের মধ্যে লিফট স্থাপনসহ অবশিষ্ট কাজ শেষ হবে। তবে এর আগেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভবনটির যে অংশ ব্যবহার করতে চাইবে, আমরা তা বুঝিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৮০০ থেকে ১ হাজার রোগী সেবা নিতে আসেন। স্থানীয়দের একটাই দাবি, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত ২৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু হোক, যাতে ঘরের কাছেই উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়।
সময়ের আলো/জোই