ঝালকাঠিতে পেয়ারায় অ্যানথ্রাক্স রোগ, ন্যায্যমূল্যহীনতায় চাষিরা

আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি

সারাদেশ

অন্যান্য অঞ্চলের মতো ঝালকাঠিতেও তীব্র খরা ও তাপপ্রবাহে মার খেয়েছে বিভিন্ন ফল ও ফসলের মুকুল। এর ব্যতিক্রম হয়নি ‘বাংলার আপেল’

2026-08-03T22:42:04+00:00
2026-08-03T22:42:04+00:00
 
  সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬,
১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
ঝালকাঠিতে পেয়ারায় অ্যানথ্রাক্স রোগ, ন্যায্যমূল্যহীনতায় চাষিরা
আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি
প্রকাশ: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪২ পিএম 
ঝালকাঠিতে পেয়ারায় অ্যানথ্রাক্স রোগ, ন্যায্যমূল্যহীনতায় চাষিরা। ছবি : সময়ের আলো
অন্যান্য অঞ্চলের মতো ঝালকাঠিতেও তীব্র খরা ও তাপপ্রবাহে মার খেয়েছে বিভিন্ন ফল ও ফসলের মুকুল। এর ব্যতিক্রম হয়নি ‘বাংলার আপেল’ খ্যাত পেয়ারার ক্ষেত্রেও। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় এ বছর ফলন বেশ কম হয়েছে। এর ওপর আবার অ্যানথ্রাক্স রোগে পেয়ারায় কালো ছিট ও দাগ দেখা দেওয়ায় কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। সব মিলিয়ে চরম হতাশা ও লোকসানের মুখে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা।

বর্তমানে পাকা পেয়ারায় সয়লাব হয়ে গেছে চারপাশ। পাকা পেয়ারার মৌ মৌ গন্ধে মুখরিত ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী দুই শ বছরেরও বেশি পুরোনো ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারার হাট। ক্রেতা-বিক্রেতা ও পাইকারদের হাঁকডাক আর পর্যটকদের পদচারণায় জমে উঠেছে এই জনপদ। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কমবেশি সব অঞ্চলেই পেয়ারার চাষ হলেও মূলত বরিশালের বানারিপাড়া, ঝালকাঠি সদর ও পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি ঘিরেই পেয়ারার বাণিজ্যিক চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে বরিশালের বানারীপাড়া ১৬ গ্রামে ৯৩৭ হেক্টর, ঝালকাঠির ১৩ গ্রামে ৫৬২ হেক্টর এবং স্বরূপকাঠির ২৬ গ্রামে ৬৪৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা বর্ষায় এই অঞ্চলের নদী-খালজুড়ে পেয়ারার সমারোহ থাকলেও, এখানকার হাজার হাজার মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন এই পেয়ারাই।


ঝালকাঠির কীর্তিপাশা, ভীমরুলী, শতদশকাঠি, খাজুরিয়া, ডুমুরিয়া, কাপুড়কাঠি, জগদীশপুর, মীরাকাঠি, শাখাগাছির, হিমানন্দকাঠি, আদাকাঠি, রামপুর ও শিমুলেশ্বর গ্রামের বিশাল অংশজুড়ে যুগ যুগ ধরে বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারার চাষ হয়ে আসছে। তবে এ বছর গাছে দেরিতে ফুল আসায় এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে বেশিরভাগ ফুল ঝরে পড়ে। বর্তমানে শ্রাবণের মাঝামাঝিতে পেয়ারার ভরযৌবন চললেও অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত হয়ে পেয়ারার গায়ে কালো ছিট ও দাগ পড়ে গেছে। ফলে মৌসুম শেষে হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

চাষিদের তথ্যমতে, প্রায় দুই শ বছর আগে বিচ্ছিন্নভাবে আবাদ শুরু হলেও ১৯৪০ সাল থেকে এখানে বাণিজ্যিক পেয়ারা চাষ শুরু হয়। ২০২৩ সালেও অন্তত ১৯৩২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক আবাদ হয়েছিল এবং ফলন হয়েছিল প্রায় ২০ হাজার টন। কিন্তু এ বছর ফলন এতই কম যে, শেষ পর্যন্ত ১০ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদন হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পঙ্কজ বড়াল বলেন, মাঘ-ফাল্গুন মাসে পেয়ারা গাছের গোড়া পরিষ্কার করে সার ও কাদা মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। এতে প্রতিটি গাছের গোড়ায় গড়ে তিন শতাধিক টাকা খরচ হয়। এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় বেশিরভাগ ফুল ঝরে পড়েছে। যা ফলন টিকেছে, তাতেও কালো ছিট পড়া দাগ বসে গেছে। বাগানের পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণের খরচই শেষ পর্যন্ত উঠবে কি না, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি। পদ্মা সেতু চালুর পর পর্যটক ও পাইকারদের আনাগোনা বাড়লেও ফলন কম ও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় লাভ তো দূরের কথা, আসল টাকাই উঠবে কি না জানি না।

আরেক কৃষক দেবব্রত হালদার বিটু জানান, পেয়ারা আমাদের মৌসুমি আয়ের একমাত্র উৎস। ফলন ভালো হলে আমাদের সংসারে সচ্ছলতা আসে। ভাসমান এই হাটে প্রতিবছর কোটি টাকার লেনদেন হয়। পর্যটক ও পাইকারদের উপস্থিতিতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও লাভবান হন। কিন্তু পেয়ারার ফলন কম হওয়া এবং অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত হওয়ায় সার্বিক লেনদেন ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

কৃষক বিপুল চক্রবর্তী বলেন, আমাদের পরিবারের তিনজনই পেয়ারা বাগান পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত থাকি। বছরের এই মৌসুমের আয় দিয়েই সারাবছর সংসার চলে। এ বছর ন্যায্য দাম না পেলে এই তিন মাস এবং পরবর্তী সময়ে কীভাবে সংসার চালাব, তা সৃষ্টিকর্তাই জানেন।

পেয়ারা মৌসুমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্যটন ব্যবসায়ী সুজন হালদার শানু জানান, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখন পর্যটকদের যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে। পর্যটকদের জন্য বাগানে নান্দনিক ভ্রমণের সুযোগ করা হলেও, ফলন কম এবং পেয়ারায় কালো দাগ থাকায় সার্বিকভাবে লোকসানের মুখে পড়ছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও পেয়ারা চাষি ভবেন হালদার বলেন, নিয়মিত পরিচর্যা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে এ বছর ফলন মার খেয়েছে। এর ওপর অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত হওয়ায় পেয়ারার গায়ে কালো দাগ দেখা দিয়েছে। এখন উৎপাদন খরচ তোলাটাই আমাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ঝালকাঠি সদর উপজেলার ১৩ গ্রামে ৫৬২ হেক্টর জমিতে লতা, মুকুন্দপুরি, স্বরূপকাঠি ও পূর্ণমণ্ডলী জাতের পেয়ারার চাষ হয়। স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ফলন কিছুটা কম হলেও ৫ হাজার ৬২৬ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, পেয়ারার অ্যানথ্রাক্স একটি মারাত্মক ছত্রাকজনিত রোগ। এটি প্রতিরোধে আক্রান্ত ডালপালা ও ফল ছাঁটাই করে ধ্বংস করতে হবে এবং ফুল আসার আগে ও পরে নিয়মিত অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   ঝালকাঠি  পেয়ারা  অ্যানথ্রাক্স রোগ  ন্যায্যমূল্যহীনতা  চাষিরা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: