বন্যা-ঘূর্ণিঝড়ের মতো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশে বজ্রপাতও এখন প্রাণহানির অন্যতম কারণ। বিশ্বের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে প্রতিবছরই বজ্রপাতে প্রাণ হারাচ্ছেন কৃষক, জেলে ও হাওরে কাজ করতে যাওয়া মানুষ। গত সাত বছরে জেলায় বজ্রপাতে ৭৯ জনের মৃত্যু হলেও প্রাণহানি কমাতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নেত্রকোণা জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে জেলায় বজ্রপাতে মারা যান ৮ জন, ২০২১ সালে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৮ জন এবং ২০২৫ সালে ১৬ জন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মারা গেছেন আরও ১৭ জন। তবে স্থানীয়দের দাবি, বজ্রপাতে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি।
বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে ধান কাটার মৌসুমে হাওর ও বিলে কৃষকদের অবস্থান বাড়ে। এ সময় ধান কাটা, মাছ ধরা কিংবা হাঁস চড়াতে গিয়ে অনেকেই বজ্রপাতের শিকার হন। বিস্তীর্ণ খোলা হাওরে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
হাওরবাসীর সুরক্ষায় ২০২২ সালে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৩৪টি ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ বা বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়। প্রতিটি দণ্ড স্থাপনে খরচ হয়েছে ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী, এসব দণ্ড হাওরের জনশূন্য ও খোলা প্রান্তরে স্থাপনের কথা থাকলেও অধিকাংশই বসানো হয়েছে বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন কিংবা লোকালয়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মাত্র দুই বছরের মধ্যেই অধিকাংশ বজ্রনিরোধক দণ্ড বিকল হয়ে যায়। কোথাও কোথাও যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে এখন শুধু লোহার খুঁটি পড়ে আছে। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাওরবাসী।
বজ্রপাত প্রতিরোধে গৃহীত তালগাছ রোপণ প্রকল্পের অবস্থাও একই। কৃষিবিদদের মতে, তালগাছের বাকলে পুরু কার্বনের স্তর থাকায় বজ্রপাত শোষণে এটি ভূমিকা রাখতে পারে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া তালগাছ রোপণ প্রকল্পের চারাগুলোর যথাযথ পরিচর্যা না হওয়ায় বর্তমানে সেগুলোর অস্তিত্বও নেই বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
হাওরের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও বৃষ্টির সময় হাওরে বজ্রপাত নিয়ে এতটা আতঙ্ক ছিল না। এখন বর্ষা ও বৃষ্টির সময় হাওরে যাওয়া অনেকের কাছেই বড় ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি জেনেও কৃষক ও জেলেদের খোলা হাওরে যেতে হচ্ছে।
নেত্রকোণা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানান, বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং এগুলো বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। বর্তমানে বৃষ্টিপাতের সময় হাওরে কৃষকদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য শেড বা বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, প্রাণহানি কমাতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি হাওরে বজ্রপাতের সময় সুরক্ষার জন্য স্থায়ী সাইক্লোন শেল্টারের আদলে আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/জোই