বাগেরহাটের ফকিরহাটে ভৈরব নদ পুনঃখননে ব্যয় হয়েছিল ২৩ কোটি টাকা। লক্ষ্য ছিল নাব্যতা ফিরিয়ে এনে জলাবদ্ধতা কমানো ও নৌপথ সচল করা। কিন্তু খননের ছয় মাসের মধ্যেই নদটি আবার পলি জমে ভরাট হয়ে যায়, বন্ধ হয়ে যায় নৌ চলাচল। স্থানীয়দের অভিযোগ- এমন অবস্থার পেছনে দায়ী ভৈরব নদের মাঝ বরাবর খুলনা ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপন ও তা রক্ষার জন্য নির্মিত লোহার কাঠামো।
বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, এসব স্থাপনা নির্মাণে তাদের কোনো অনুমতি বা ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি ওয়াসার পক্ষ থেকে। নদের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের কাঁঠালতলা সেতুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের এক দায়িত্বশীল প্রকৌশলী জানান, পাইপলাইনের কারণে ওই স্থানে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে নদের তলদেশ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মিরাজ মোল্লা বলেন, প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী নদে অন্য কোনো সংস্থা কর্তৃক স্থাপনা নির্মাণ বা পাইপলাইন স্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু ফকিরহাটে ভৈরব নদের মাঝ বরাবর খুলনা ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপন এবং নদে আটকে লোহার কাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে এমন কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি।
বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি। শুনেছি পাইপটি সরিয়ে নিতে অথবা নদের তলদেশে স্থানান্তরের বিষয়ে ওয়াসা এবং জেলা প্রশাসনের কাছে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আবারও সংশ্লিষ্ট দফতরে লিখবেন বলেও জানান বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল।
খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহ বলেন, বর্তমান অবস্থান থেকে পাইপলাইনটি নদের তলদেশে স্থানান্তরের জন্য প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শুরু হলে পাইপটি স্থানান্তরের কাজও করা হবে। তবে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজ কবে শুরু হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেননি খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই জাইকার অর্থায়নে খুলনা মহানগরীতে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য মোল্লাহাট উপজেলার মধুমতি নদী থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি নেওয়ার প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়। ভৈরব নদ অতিক্রমের সময় পাইপলাইনটি নদের তলদেশ দিয়ে না নিয়ে মাঝ বরাবর স্থাপন করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, তখনই তারা এর বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নেয়নি। পাইপলাইন স্থাপনের পর নদের স্বাভাবিক স্রোত কমে গিয়ে দ্রুত পলি জমতে শুরু করে। বর্ষা মৌসুম এলেই দেখা দিতে থাকে জলাবদ্ধতা। এমন পরিস্থিতিতে ফকিরহাট ও আশপাশের এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নৌপথ সচল রাখতে ২০২০-২১ অর্থবছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড ভৈরব নদের প্রায় সাড়ে ১৭ কিলোমিটার পুনঃখনন করে। ৯১ ফুট প্রশস্ত ও ১৬ ফুট গভীর এ খননকাজে ব্যয় হয় ২৩ কোটি টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুনঃখননের পর নদের স্রোতের গতি বাড়লে ২০২১ সালের জুলাই মাসে পাইপলাইন রক্ষায় ওয়াসা নদের ভেতর আড়াআড়ি লোহার খুঁটি ও বেষ্টনী নির্মাণ করে। এমনকি পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় নদে ট্রলার চলাচল নিষিদ্ধ করে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয় ওয়াসা। সাড়ে পাঁচ ফুট উঁচু পাইপে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় ছোট-বড় সব ধরনের নৌ চলাচল। অল্প সময়ের মধ্যেই নদে পলি জমে যায়। দেখে মনে হয়, নদ নয় যেন নালা। পাইপের কারণে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ছোট-বড় নৌকা ও ট্রলার চলাচল। স্থানীয়দের মতে, পাইপের কারণে নদটি দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ায় পুনঃখননে ব্যয় করা ২৩ কোটি টাকা কার্যত কোনো কাজেই আসেনি।
সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের কাঁঠালতলা সেতুর নিচে নদের মাঝ বরাবর প্রায় ৮ বছর আগে স্থাপিত পাইপলাইনটি এখনও আগের অবস্থানেই রয়েছে। পাইপ রক্ষায় দেওয়া লোহার বেষ্টনীর কারণে নৌযান চলাচল সম্ভব হচ্ছে না। ভরাট হয়ে নদের তলদেশের বিস্তীর্ণ অংশে গজিয়ে উঠেছে ঝোপঝাড়। শুধু নালার মতো একটা পানি প্রবাহ রয়েছে নদের পরিবর্তে।
পাইপলাইন স্থাপনের প্রায় আট বছর পার হলেও সেটি নদের তলদেশে স্থানান্তর কিংবা পুনঃস্থাপনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ফলে উপজেলায় বসবাসরত ১ লাখ ৫৯ হাজার মানুষের একটি বড় অংশ বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটের প্রভাব মোকাবিলা করছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, মৎস্য এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। গত বর্ষা মৌসুমে নদ দিয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হওয়ায় ফকিরহাট ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে ফসলি জমি ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয় বলেও জানান স্থানীয়রা।
ফকিরহাট বাজারের ব্যবসায়ী মুকুন্দ পাল বলেন, নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। নদের পথ সচল থাকলে খুলনা, মোংলা বন্দর, বাগেরহাট ও বরিশালের সঙ্গে কম খরচে পণ্য পরিবহন সম্ভব হতো।
স্থানীয়দের দাবি, আট বছর ধরে প্রতিশ্রুতি শুনলেও বাস্তবে সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। তারা অবিলম্বে পাইপলাইন নদের তলদেশে স্থানান্তর, ভৈরব নদে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রবাহ নিশ্চিত, জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসন এবং নৌপথ পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি