সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নে সারা বছরই চলছে যমুনার ভাঙন। বর্ষায় তীব্র স্রোত আর শুষ্ক মৌসুমে নদীর গতিপথ পরিবর্তনে ভাঙন যেন এ অঞ্চলের মানুষের স্থায়ী আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বহু ঘরবাড়ি, আবাদি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। বসতভিটা হারিয়ে অনেকে জরাজীর্ণ ঘর কিংবা পলিথিনের ছাউনিতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সোনাতনী ইউনিয়নের কুরশি ও ধীতপুর গ্রামের বিভিন্ন সময়ে যমুনার ভাঙনে দুই শতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবারের নতুন করে ঘর তোলার মতো জায়গা নেই। ফলে কেউ ভাঙনকবলিত এলাকায় পলিথিন টানিয়ে, আবার কেউ মাছ ধরার জাল দিয়ে ঘিরে জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করছেন।
নদীগর্ভে ধীতপুর-কুরশি গরুর হাট-বাজারও বিলীন হওয়ায় কৃষিপণ্য ও গবাদিপশু বেচাকেনায় সংকটে পড়েছেন স্থানীয়রা। এতে কৃষকদের আয় কমে গিয়ে অর্থকষ্ট আরও বেড়েছে। ভাঙনকবলিত অনেক বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় অন্ধকারেই দিন কাটছে তাদের।
স্থানীয়দের দাবি, ভাঙনের তাণ্ডবে সোনাতনী ইউনিয়নে এ পর্যন্ত দুটি মসজিদ-মাদ্রাসা, দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি অফিসঘর, দুই শতাধিক বাড়িঘর, প্রায় দুই হাজার বিঘা আবাদি জমি ও অসংখ্য গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এসব জমিতে ধান, পাট, সরিষা, বাদাম, তিল, কাউন, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হতো। জমিজমা হারিয়ে এসব এলাকার বহু কৃষক এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
ভাঙনকবলিত ধীতপুর গ্রামের আন্না খাতুন (রুমা) জানান, স্বামী তাঁকে ছেড়ে যাওয়ার পর গত এক বছর ধরে এক শিশুকন্যাকে নিয়ে কৃষিশ্রমিক বাবা আব্দুল লতিফ ও মা রেহানা খাতুনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। সম্প্রতি যমুনার ভাঙনের মুখে তাঁর বাবার বাড়িটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে। এখন শূন্য ভিটায় একটি পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ ঘরে মা ও শিশুকন্যাকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি।
আন্না খাতুন বলেন, ঘরটির এক পাশে বেড়া নেই। কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের হাত থেকে রক্ষা পেতে মাছ ধরার ঝাঁকিজাল দিয়ে সেটি ঘিরে রাখা হয়েছে। অন্য পাশের পাটকাঠির বেড়া পচে খসে পড়ছে। ঘরের চালও নুইয়ে গেছে। যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে এ ঘরেই থাকতে হচ্ছে। গত কয়েক দিনে কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ধীতপুর গ্রামের আছিয়া খাতুন বলেন, যমুনার ভাঙনে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় শূন্য ভিটায় খোলা আকাশের নিচে পলিথিন টানিয়ে আছেন। বৃষ্টি হলে সবকিছু ভিজে যায়। কোথায় যাবেন, সেটিও এখনো ঠিক করতে পারেননি। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে বলে জানান তিনি।
একই গ্রামের বাচ্চু মোল্লা ও আবুল বেপারী বলেন, তাদের এলাকায় সারা বছরই যমুনার ভাঙন থাকে। এভাবে আরও কিছুদিন ভাঙন চলতে থাকলে ঘরবাড়ি হারিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে রাস্তায় থাকতে হবে। তাদের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি কর্মকর্তা ভাঙনকবলিত এলাকায় এসে তাদের খোঁজ নেননি।
ভাঙনের হুমকিতে থাকা কুরশি গ্রামের সুজাবত মোল্লা ও ইয়াসিন মোল্লা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন তারা। বর্তমানে যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে, তাতে যেকোনো সময় তাদের বাড়িঘরও যমুনায় বিলীন হয়ে যেতে পারে।
সোনাতনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মো. এ এম সাইদুর রহমান বলেন, তাঁর ৩০ বিঘা ফসলি জমির মধ্যে গত কয়েক বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বিঘা যমুনায় বিলীন হয়েছে। দ্রুত ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শত শত পরিবার ভাঙনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যাবে।
এবি পার্টির শাহজাদপুর উপজেলা শাখার আহ্বায়ক ও কুরশি হাটের সার ব্যবসায়ী মো. হাফিজুর রহমান বলেন, গত তিন বছরে তাঁর চোখের সামনে মসজিদ-মাদ্রাসা, ফসলি জমি ও বহু ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙতে ভাঙতে কুরশি হাটও ছোট হয়ে এসেছে। ভাঙনরোধে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। দ্রুত ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ভাঙনরোধে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ইতোমধ্যে একটি প্রকল্প পাওয়া গেছে। পাঁচটি জেলার নদীভাঙনকবলিত এলাকায় ওই প্রকল্পের আওতায় কাজ করা হবে। প্রকল্পের কাজ শুরু হলে সোনাতনী ইউনিয়নেও ভাঙনরোধে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তারা।
তিনি আরও বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড সবসময় ভাঙনকবলিত এলাকার খোঁজখবর রাখছে। জরুরি ভিত্তিতে কোনো বাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল বা কলেজ ভাঙনের কবলে পড়লে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সময়ের আলো/এসএকে