গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী বাজার এলাকায় প্রায় এক দশক আগে নির্মাণ করা হয়েছিল ১০ শয্যাবিশিষ্ট একটি মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র। উদ্দেশ্য ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় নিরাপদ মাতৃসেবা, শিশু স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবার পরিকল্পনাসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু ভবন নির্মাণের প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালটি আজও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক অবকাঠামো কার্যত অব্যবহৃত পড়ে আছে, আর স্থানীয় হাজারো মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরেজমিন স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ৩০ এপ্রিল, ২০১৭ সালে তিন তলাবিশিষ্ট এই ১০ শয্যার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। ভবনটিতে আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, রোগীদের জন্য ওয়ার্ড, ল্যাবরেটরি, চিকিৎসকদের কক্ষ, প্রসূতি সেবা ইউনিট এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, শয্যা, জনবল ও ওষুধের অভাবে উদ্বোধনের পর থেকেই হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার অধিকাংশ কক্ষ দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
বর্তমানে হাসপাতালটির নিচ তলার মাত্র দুটি কক্ষে সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে একজন স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের একজন কর্মী রোগীদের প্রাথমিক সেবা দিয়ে থাকেন। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ রোগী চিকিৎসার আশায় কেন্দ্রে এলেও অধিকাংশই কাক্সিক্ষত সেবা না পেয়ে ফিরে যান। এ ছাড়া গত তিন মাস ধরে কেন্দ্রটিতে কোনো ধরনের সরকারি ওষুধ সরবরাহ না থাকায় রোগীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আপেল মাহমুদ হাসান বলেন, মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা গেলে হাজারো মা ও শিশু এখান থেকেই উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারবেন বলেও মন্তব্য করেন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আপেল মাহমুদ হাসান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ বছরের পর বছর শূন্য পড়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মেডিকেল অফিসার, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় আধুনিক ভবনটি কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে বছরের পর বছর ধরে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি কক্ষে একজন চিকিৎসকের নামফলক থাকলেও তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন না বলেও অভিযোগ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
আলাপকালে স্থানীয়রা হতাশা ও দুঃখ প্রকাশ করেন। তারা হতাশার সুরে জানান, সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি হাসপাতাল বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাদের দাবি, শুধু ভবন নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেখানে দক্ষ চিকিৎসক, নার্স, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও আধুনিক চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে। তারা দ্রুত হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
কথা হয় বরমী ইউনিয়নের বরকুল গ্রামের বাসিন্দা সেবাপ্রত্যাশী মোসাম্মত আছিয়া আক্তারের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, আমরা গরিব মানুষ। এই হাসপাতাল চালু থাকলে অনেক উপকার হতো। এখন সামান্য চিকিৎসার জন্যও দূরে যেতে হয়। এতে সময় ও টাকা দুটোই নষ্ট হয়। সেবাপ্রত্যাশী মোসাম্মত আছিয়া আক্তার আরও বলেন, আমরা চাই গ্রামের সহজ, সরল ও অসহায় মানুষের কথা চিন্তা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হোক।
শীতলক্ষ্যা নদী পেরিয়ে কাপাসিয়া উপজেলার সিংহশ্রী ইউনিয়নের কোরিয়াদী গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ৭০ বছর বয়সি মেহেরজানের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত বড় হাসপাতাল বানিয়ে যদি চিকিৎসক না থাকে, ওষুধ না থাকে, তা হলে সাধারণ মানুষের কী লাভ? ৭০ বছর বয়সি মেহেরজান আরও বলেন, আমরা ভালো চিকিৎসার আশায় আসি, কিন্তু হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়। কী আর করা! নিজে সুস্থ থাকার জন্য চিকিৎসা তো নিতে হবে। তাই কষ্ট করে দূরে গিয়ে হলেও ডাক্তার দেখাতে হবে।
স্থানীয়দের মতে, এই হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে শুধু শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নই নয়, আশপাশের ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী কাপাসিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার কয়েক হাজার মানুষ সহজেই মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারবেন। তাই অবিলম্বে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ওষুধ সরবরাহ করে হাসপাতালটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি