জরাজীর্ণ ভবন ও শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে শিক্ষাকার্যক্রম

নড়াইল প্রতিনিধি

সারাদেশ

নড়াইল শহরের নারী শিক্ষা প্রসারের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যাপীঠ নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠ

2026-08-04T13:33:48+00:00
2026-08-04T13:38:48+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬,
২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
জরাজীর্ণ ভবন ও শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে শিক্ষাকার্যক্রম
নড়াইল প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ১:৩৩ পিএম  আপডেট: ০৪.০৮.২০২৬ ১:৩৮ পিএম
নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ছবি : সময়ের আলো
নড়াইল শহরের নারী শিক্ষা প্রসারের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যাপীঠ নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠ দীর্ঘ ৭ দশকেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জেলায় নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতি বছরই এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় সুনামের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে দেশের স্বনামধন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করে। তবে, ঐতিহ্য ও অর্জনের সাফল্যমণ্ডিত এই ভাবমূর্তির আড়ালে বর্তমানে প্রকট হয়ে উঠেছে নানা অবকাঠামোগত ও প্রশাসনিক সংকট।

বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে চরম শিক্ষক স্বল্পতা, জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান এবং কতিপয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ন্ত্রিত কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ পাঠদান কার্যক্রমের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন সমাজ।

অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যালয়টির স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে শিক্ষকদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রাইভেট ও কোচিং নির্ভরতা। অভিযোগ রয়েছে, শ্রেণির পাঠদানে পূর্ণ মনোযোগ না দিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেটে পড়ার জন্য পরোক্ষ মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।


কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্ধারিত প্রাইভেটে অংশ না নিলে পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত নম্বর না পাওয়া এবং শ্রেণির পাঠদানে কোণঠাসা হয়ে থাকার ভয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেককে সেখানে ভর্তি হতে হচ্ছে। প্রতি মাসে এই বাবদ শিক্ষার্থীপ্রতি বাড়তি ১ হাজার থেকে বারোশত টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে, যা অসচ্ছল পরিবারের জন্য অতিরিক্ত চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

তবে, এই বিষয়ে সাধারণ শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে মতভেদও রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, পাঠ্যক্রম বিশাল হওয়া এবং শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের প্রয়োজনেই অতিরিক্ত সহায়তার জন্য শিক্ষকদের শরণাপন্ন হয়। এটিকে একতরফাভাবে ‘বাধ্য করা’ হিসেবে দেখা ঠিক নয় বলে দাবি তাদের।

শিক্ষার পরিবেশসংক্রান্ত আলোচনার পাশাপাশি বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত সংকটও প্রকট রূপ ধারণ করেছে। সরজমিনে দেখা যায়, বহু পুরনো অ্যাকাডেমিক ভবনটি দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবনের বিভিন্ন অংশের ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং ভেতর থেকে জং ধরা রড বেরিয়ে এসেছে। সুরক্ষার স্বার্থে ভবনটির তৃতীয় তলা ইতোমধ্যে ‘পর পরিত্যক্ত’ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা থেকেই প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ক্লাস পরিচালনা করতে হচ্ছে। প্রতিনিয়ত কাঠামোগত দুর্ঘটনার আতঙ্ক নিয়ে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকদের মাঝেও প্রতিদিন সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে নিরাপদে ফিরে পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ কাজ করছে।


কোচিং বাণিজ্য ও অনিয়মের সব ধরনের অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সনাতন রায়। তিনি জানান, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়ম ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গেই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান পরিচালনা করেন। খাতায় নম্বর কম দেওয়া বা অনিয়মের অভিযোগটি ভিত্তিহীন।

তবে অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমাদের শ্রেণিকক্ষের সংকট প্রকট এবং তীব্র শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। আমরা বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সর্বোচ্চ সাধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করছি। নতুন ভবন নির্মাণ ও ঝুঁকি নিরসনে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি।’

বিদ্যালয়ের বিদ্যমান সংকট পর্যবেক্ষণ ও সরেজমিনে পরিস্থিতি জানতে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম। পরিদর্শনের সময় তিনি শিক্ষক সংকট দূরীকরণ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।


তবে, বিদ্যালয় চত্বরে চলমান নতুন ভবন নির্মাণকাজ পরিদর্শনকালে তিনি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। নির্মাণকাজে মানসম্মত রড, ইট ও সিমেন্ট ব্যবহার না করার অভিযোগ এনে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও তদারককারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দেন তিনি।

সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘একটি ঐতিহ্যবাহী নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণে কোনো ধরনের নিম্নমানের কাজ বরদাস্ত করা হবে না। নতুন ভবনের কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের টেকসই সমাধানের জন্য কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

নড়াইলের সর্বস্তরের জনগণ ও অভিভাবক মহল মনে করেন, বিদ্যালয়টির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সুনাম রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিক্ষক স্বল্পতা দ্রুত পূরণ করা, প্রাইভেট-কোচিংকেন্দ্রিক অনিয়ম বন্ধে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োগ এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় দ্রুত বস্তুনিষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।

সময়ের আলো/মহু



  বিষয়:   নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়  জরাজীর্ণ  ভবন  শিক্ষক  সংকট  শিক্ষাকার্যক্রম  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: