পাহাড়সম প্রতিবন্ধকতায় মামলায় জট

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী ও আদিল সরকার

জাতীয়

ঠিক দুই বছর আগে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান হয়। বৈষম্যবিরোধী অন্দোলনে নিহত হন

2026-08-05T01:39:35+00:00
2026-08-05T01:39:54+00:00
 
  বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
গণ-অভ্যুত্থানে হতাহত
পাহাড়সম প্রতিবন্ধকতায় মামলায় জট
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী ও আদিল সরকার
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১:৩৯ এএম  আপডেট: ০৫.০৮.২০২৬ ১:৩৯ এএম
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশের গুলি।
ঠিক দুই বছর আগে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান হয়। বৈষম্যবিরোধী অন্দোলনে নিহত হন ১৪ শতাধিক মানুষ। আহতের সংখ্যাও অনেক। চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন কিংবা অঙ্গহানি হয়েছে এমন সংখ্যাও অনেক। এসব ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানা ও আদালতে ১৮ শতাধিক মামলা হয়। বিগত দুই বছরে মাত্র ১৪ শতাংশ মামলার তদন্তকাজ শেষ করতে পেরেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

তবে মিথ্যা মামলাসহ অধিকাংশ মামলায় শত শত আসামি থাকায় নানা প্রতিবন্ধকতায় মামলা তদন্তে হিমশিম খাচ্ছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ফলে বিলম্ব হচ্ছে মামলা তদন্তে।

প্রতিবন্ধকতা : 

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় গত দুই বছরে মাত্র ১৪ শতাংশ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় বেশ কিছু কারণে মামলা তদন্তে বেশ সময় লাগছে।

মামলা তদন্তে বিলম্বের অন্যতম প্রধান কারণ অধিকাংশ মামলাতেই ঢালাও আসামি করা হয়েছে। এসব মামলার আসামিদের নাম ঠিকানা যাচাই করতেই দীর্ঘ সময় লাগছে। একেকটি মামলায় শত শত আসামি করা হয়েছে। শত শত আসামির ঠিকানা ও তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই করতেই প্রচুর সময় লাগছে।

নিহত ও আহতের ঘটনায় মামলা তদন্তের ক্ষত্রে এমসি বা মেডিকেল সার্টিফিকেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই এমসি পেতেই তিন ধরনের প্রকিবন্ধকতার কথা জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এগুলো হলো- এমসি পেতে বাদী ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বা আইওকে সশরীরে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই বাদী ও আইও একসঙ্গে উপস্থিত হতে পারছেন না। 

দ্বিতীয়ত অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বাদী এমসি হারিয়ে ফেলেছেন। তৃতীয়ত হাসপাতাল বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ডিএমসি) কর্তৃপক্ষ সময়মতো এমসি দিতে পারছে না। এ বিষয়টি নিয়ে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে একাধিকবার বৈঠক হলেও কোনো সুরাহা হয়নি।

এ ছাড়া বাদী, আসামি ও সাক্ষীদের নাম-ঠিকানা যাচাই করতেও বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে তদন্তকারীদের। অনেক মামলাতেই বাদী, আসামি ও সাক্ষীদের পরিপূর্ণ নাম-ঠিকানা নেই। অনেক ক্ষেত্রে বাদী ঢাকা ত্যাগ করে গ্রামে চলে গেছেন। আবার যেসব ঘটনা প্রমাণিত সেসব ঘটনাতেও অনেক ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ঠিকানা পাওয়া যাচ্ছে না। এসব ঠিকানা যাচাই করতে দীর্ঘ সময় লাগছে।

এ ছাড়া সাক্ষী নিয়েও বিড়ম্বনার কথা বলেছেন তদন্তকারীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই সাক্ষ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। গুলির ব্যালিস্টিক রিপোর্ট ও বিশেষজ্ঞের মতামত পেতেও সময় লাগছে। জুলাইয়ের ঘটনায় নিহত অনেকের মরদেহই ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়। ফলে মামলা নিষ্পত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রাপ্তি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

মিথ্যা মামলা :  

জুলাইয়ের ঘটনায় করা মামলাগুলোর তদন্ত করতে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা অনেক মিথ্যা, অসত্য ও ভুয়া মামলার সন্ধান পেয়েছেন। পূর্বশত্রুতার জেরে শুধু হয়রানি করার জন্য নিরীহ ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। আর্থিক লাভের অসৎ উদ্দেশ্যেও অনেককে আসামি করা হয়েছে। ভুয়া ও অসত্য মামলা পাওয়ার তথ্য আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও জাতীয় সংসদে স্বীকার করেছেন। 

তিনি জানিয়েছেন, বিপুলসংখ্যক মামলার তদন্ত একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। অন্যদিকে মামলাগুলোর তদন্ত করতে গিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা শত্রুতা ও হয়রানিমূলক মামলা এবং বাদীর দেখা না পাওয়াসহ নানা ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছেন বলেন জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

সবচেয়ে বেশি ভুয়া মামলা পাওয়া যাচ্ছে সিআর বা আদালতে করা মামলাগুলোতে। আর ভুয়া মামলায় বেশি টার্গেট করা হয়েছে ব্যবসায়ীদের।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ (এ) ধারায় ২ আগস্ট পর্যন্ত ৮৬২টি মামলায় পাঁচ হাজার ৪১৬ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। মামলায় বাদী যে অভিযোগ করেছেন তার সত্যতা না পাওয়ায় মামলা থেকে অব্যাহতির জন্য সুপারিশ করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

পরিসংখ্যান :

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়,গত দুই বছরে বৈষম্যবিরোধী ঘটনায় ১ হাজার ৮৬৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে তদন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৬৮টির। তদন্ত নিষ্পত্তির হার ১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বাকি মামলাগুলোর তদন্ত ঝুলে আছে নানা কারণে।

হত্যা ও অন্যন্য মামলাসহ মোট অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে ২১২টি। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামির মোট সংখ্যা ১৬ হাজার ৯৩২ জন। এরমধ্যে ৫ হাজার ৮৫৭ জন হত্যা এবং ১১ হাজার ৭৫ জন অন্যান্য মামলার আসামি।


হত্যা মামলায় এজাহারনামীয় আসামি ৬৫ হাজার ২১০ জন এবং সন্ধিগ্ধ আসামি ২ লাখ ৫১ হাজার ৮৫১ জন। অন্যান্য মামলায় এজাহারনামীয় আসামির সংখ্যা ৮৯ হাজার ১২১ জন, আর সন্ধিগ্ধ আসামির সংখ্যা ১ লাখ ৭৭ হাজার ৪৬৮ জন।
জানা যায়, এখন পর্যন্ত কোনো মামলারই বিচার শুরু হয়নি।

ডিএমপি :

ঢাকা মহানগরীতে মোট ৭৯০টি মামলা করা হয়েছে। যার মধ্যে ৪৮০টি হত্যা মামলা এবং বাকি ৩১০টি অন্যান্য ধারার মামলা। এর মধ্যে তদন্ত শেষে মধ্যে ২৮টি মামলায় চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। যার মধ্যে ২৩টি হত্যা মামলা। বাকি পাঁচটি অন্য ধারার মামলা।

সিআইডি :

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায়, ৮৯টি মামলার তদন্ত করছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এর মধ্যে জেনারেল রেজিস্টার (জি আর) বা থানায় এফআইআর হিসেবে দায়ের করা মামলার সংখ্যা ৭৩টি। অন্যদিকে কমপ্লেইন্ট রেজিস্টার (সি আর) বা আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ আকারে করা মামলার সংখ্যা ১৬টি। তবে এসব মামলার মধ্যে মাত্র পাঁচটি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। যেখানে আসামি করা হয়েছে ৩১৭ জনকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু তালেব সময়ের আলোকে বলেন, সাক্ষী না পাওয়া, সময়মতো ডকুমেন্ট ও প্রমাণ না উল্লেখ করতে পারাসহ অন্যান্য মামলার যেরকম স্বাভাবিক বাধা বা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এখানেও সেসব রয়েছে। আমরা নিয়ম অনুযায়ী মামলাগুলোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি দ্রুত কাজ শেষ হবে।

ডিবি :

এ ছাড়া নিজেদের দায়িত্বে থাকা জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর মধ্যে বেশ কিছু মামলার তদন্ত ইতিমধ্যে শেষ করেছে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। সর্বশেষ ৯ মাসে ৬টি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান। এ ছাড়া বর্তমানে আরও ৫৯টি মামলা তাদের কাছে তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। 


মামলাগুলোর অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবি প্রধান অতিরিক্তি কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, প্রতিটি মামলায় আসামির সংখ্যা অনেক এবং গণহারে আসামি করা হয়েছে। ফলে তাদের অবস্থান শনাক্ত এবং আন্দোলনকালে তাদের ভূমিকা যাচাই করতে হচ্ছে। সে সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ফরেনসিক বিশ্লেষণের বিষয়ও রয়েছে। সবমিলিয়ে অনেক সময় লাগছে। 

তিনি বলেন, আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৪০ জিবি ডেটা আমাদের কাছে রয়েছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মামলাগুলোর তদন্ত করছি।

পিবিআই :

অন্যদিকে প্রায় ৩০০ মামলা তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সংস্থাটির কাছে থাকা জিআর মামলা ৮২টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়েছে ৪৪টি মামলা। এ ছাড়া সংস্থাটির হাতে সিআর মামলা রয়েছে ১৯৯টি। যার মধ্যে ১৬৬টি মামলা নিষ্পত্তি করতে পেরেছে পিবিআই। এতে প্রমাণিত হয়েছে ১০২ টি মামলা এবং অপ্রমাণিত হয়েছে ৩৩টি। 

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সংশ্লিষ্ট মামলার দায়িত্বে থাকা পিবিআইয়ের কর্মকর্তা ও সংস্থাটির মিডিয়া উইংয়ের প্রধান পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ সময়ের আলোকে বলেন, সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে অনাগ্রহ, মেডিকেল রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময়, বিশেষজ্ঞদের মত পেতে দীর্ঘ সময় ও বাদীর মামলা চালাতে অনীহাসহ বিভিন্ন কারণে তদন্তে সময় লাগছে। তবে পিবিআই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মামলাগুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   প্রতিবন্ধকতা  মামলা  জট  গণ-অভ্যুত্থান 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: