অর্জন আছে, অপূর্ণতাও অনেক

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান, বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত

2026-08-05T02:11:14+00:00
2026-08-05T02:40:58+00:00
 
  বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা-প্রাপ্তির ২ বছর
অর্জন আছে, অপূর্ণতাও অনেক
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ২:১১ এএম  আপডেট: ০৫.০৮.২০২৬ ২:৪০ এএম
৫ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গনে লাখো মানুষ। ছবি : সময়ের আলো
২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান, বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশা নিয়েই রাজপথে নেমেছিল লাখো মানুষ। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে পাঁচ আগস্ট জনগণের বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বৈরাচার হাসিনার পতন ঘটে।  

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রব্যবস্থার দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। কিন্তু অভ্যুত্থানের দুই বছর পর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর ও নির্বাচিত সরকারের সাড়ে পাঁচ মাসে জুলাইয়ের প্রত্যাশা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, বিশ্লেষক এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার মধ্যেই তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। দুই বছর পরও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলানোর পাশাপাশি গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন কতটা পূরণ হলো তা নিয়েও চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের সাধারণ মানুষ জাতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার ফিরে পেলেও গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্রীয় সংস্কার, প্রশাসনের দলীয়করণ দূরীকরণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বৈষম্য নিরসনের মতো মৌলিক ইস্যুগুলোতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি এখনও দৃশ্যমান হয়নি। ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা কমেছে এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন করে মেরুকরণ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। যদিও বর্তমান সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের আলোকে আইন সংশোধন এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, তবে বাস্তবায়নের গতি নিয়ে রয়েছে অসন্তোষ।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪-এর পাঁচ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল-অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল আন্দোলনের অন্যতম মূল লক্ষ্য। কিন্তু দুই বছর পরও বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি, সংস্কারের সীমিত বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে সেই প্রত্যাশার বড় অংশ অপূর্ণই রয়ে গেছে। 

তবে ইতিবাচক দিক হচ্ছে গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি বেড়েছে। নাগরিক অধিকার, ভোটাধিকার, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি জনমতের প্রতি সংবেদনশীল। 

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান। তবে রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার সংস্কারের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাচ্ছে। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়ে রায় দিলেও সে রায়টা এখনও কার্যকর করা হচ্ছে না। 

আখতার হোসেন বলেন, সরকার যদিও বলছে জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে, কিন্তু তাদের কথার মধ্যে সংস্কার থেকে পিছিয়ে যাওয়ার একটা বাহানা তারা খোঁজে। তারা ভাবছে সংসদে দুই-তৃতীংয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে তারা যেভাবে চাইবে, সেভাবেই সংবিধানটা কাটছাঁট করতে পারবে। সে কারণে তারা এখন আর বিরোধী দলের কথা কর্ণপাত করছে না। একই সঙ্গে জুলাইসংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিচার নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মনে করেন, আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বৈষম্য দূর করা। কিন্তু বাস্তবে গত দুই বছরে বৈষম্য আরও বেড়েছে। তার ভাষায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরও বৈষম্য বিলোপের জন্য কোনো আলাদা কমিশন হয়নি। নতুন করে লাখো মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে এসেছে। কর্মসংস্থান বাড়েনি, বিনিয়োগও প্রত্যাশিতভাবে বাড়েনি। আমরা যে চেতনা নিয়ে আন্দোলন করেছিলাম, বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখছি।

বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, শ্রম এবং নারীবিষয়ক মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এসব কমিশন শত শত সুপারিশ জমা দিলেও বাস্তবায়িত হয়েছে সীমিত পরিসরে। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের গতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, প্রশাসনিক সংস্কারের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। তার মতে, কোন সংস্কার হবে আর কোনটি হবে না তা নির্ধারণ করেছে আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী অংশ। ফলে প্রকৃত কাঠামোগত পরিবর্তনের পরিবর্তে ব্যক্তি বদলের মধ্যেই অনেক উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থেকেছে। পদোন্নতি ও পদায়নে স্বচ্ছ মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়নি, স্বাধীন সিভিল সার্ভিসব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। ক্ষমতার হাতবদলের প্রক্রিয়ায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা, এমনকি সচিবালয়ে মবসহ অভূতপূর্ব অরাজকতা হয়েছে। 

এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অন‍্যসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি খাতের মতো সরকারি চাকরিতে সার্বিকভাবে দলীয়করণের প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য নীতিও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে ব্যক্তি বদলে গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন মুখ এসেছে। কিন্তু আনুগত্যভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি কতটা বদলেছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, বৈষম্য দূর করতে হলে ব্যক্তি পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন ছিল প্রতিষ্ঠান ও আইনি কাঠামোর পরিবর্তন। কিন্তু পাঁচ আগস্টের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে যা হয়েছে, তার বড় অংশই নেতৃত্ব ও ক্ষমতার হাতবদল। কাঠামোগত সংস্কার বলতে জবাবদিহি, বৈষম্যহীনতা, সর্বজনীন অধিকার এবং কার্যকর প্রতিকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা বোঝায়। পুরোনো কাঠামোর মধ্যে শুধু নতুন মানুষ বসিয়ে প্রকৃত সংস্কার করা যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম মনে করেন, কাঠামোগত সংস্কারের পূর্ণ মূল্যায়নের জন্য আরও সময় প্রয়োজন। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকার বিভিন্ন খাতে পরিবর্তনের চেষ্টা করছে; কিন্তু দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও দুর্নীতিপরায়ণ গোষ্ঠীর প্রতিরোধের কারণে কাক্সিক্ষত গতিতে এগোতে পারছে না। বড় প্রকল্পে ব্যয়, বিদেশ সফর এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও আগের তুলনায় নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। তবে এখনও অনেক ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও সরকার সতর্ক। সরকার অনেক কিছু করার চেষ্টা করছে। তাই সংস্কারের প্রকৃত ফলাফল বুঝতে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।


অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহম্মদের মতে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ও নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেলেও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবার জনস্বার্থবিরোধী তৎপরতা শুরু হতে দেখা গেছে। রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় জনস্বার্থবিরোধী প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তার মতে, জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং বৈষম্য দূরীকরণে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান নির্বাচিত সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করতে সরকার ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে। গণতান্ত্রিক ধারা শক্তিশালী করতে হলে সংবিধানেই তা সবার আগে ধারণ করতে হবে। জনপ্রত্যাশা পূরণ ও রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে সমঝোতার ভিত্তিতেই সংবিধানে সংশোধনী আনা হবে। আমরা সমঝোতার ভিত্তিতে এমন একটি সংশোধনী গ্রহণ করতে চাই, যা জনপ্রত্যাশা পূরণ করবে। 

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি


  বিষয়:   অর্জন  অপূর্ণতা  গণ-অভ্যুত্থান 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: