প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’

জাতীয়

২০২৪ সালের জুলাই মাস ধরে চলা ফ্যাসিস্টবিরোধী জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস, ত্যাগ ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রত্যয়ে নির্মিত

2026-08-05T02:23:37+00:00
2026-08-05T02:49:05+00:00
 
  বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ২:২৩ এএম  আপডেট: ০৫.০৮.২০২৬ ২:৪৯ এএম
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর। ছবি : সংগৃহীত
২০২৪ সালের জুলাই মাস ধরে চলা ফ্যাসিস্টবিরোধী জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস, ত্যাগ ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রত্যয়ে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’। বহুল প্রতীক্ষিত জাদুঘরটি ঘিরে সাধারণ মানুষের কাছে রয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। গত দুই বছর ধরে ওই ভবনের পাশ দিয়ে যাতায়াতকারী সবাই এক পলক হলেও দৃষ্টি ফেলেছেন সেদিকে। আর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ কিছুটা সময় হলেও থমকে দাঁড়ান ভবনের প্রধান ফটকের সামনে। 

সবার একই জিজ্ঞাসা, কবে খুলবে জাদুঘরটি? কী আছে এর ভেতরে? দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই গণভবনটি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণবিক্ষোভের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছিলেন এখানে। তবে সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ৫ আগস্ট জাদুঘরটি উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপরের দিনই সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে জাদুঘরটি।

গত শুক্রবার সরেজমিন জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে গিয়ে দেখা যায় বন্ধের দিনও কর্মব্যস্ত দিন পার করছেন বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি মেলেনি। শ্রমিকদের ভেতরে আসা-যাওয়ার দৃশ্যে শেষ মুহূর্তের কাজের ব্যস্ততা দৃশ্যমান হয়।

জাদুঘরটি সর্বসাধারণের জন্য খোলার কিছু নমুনা বাইরে থেকেই দৃশ্যমান হচ্ছে। ‘প্রবেশ পথ’; ‘টিকেট’ এ রকম কয়েকটি সাইনবোর্ড প্রধান ফটকের বাইরে এখন দৃশ্যমান।

প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে কথা হয় জাতীয় জাদুঘরের কর্মী জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। তিনি জানালেন, পুরোদমে ভেতরে কাজ চলছে। গণপূর্ত ও জাতীয় জাদুঘরের কর্মকর্তারা নিয়মিত তদারকি করছেন। প্রতিদিনই অনেক কৌতূহলী মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় বলে জানান তিনি। সবার একটাই জিজ্ঞাসা থাকে- ‘কবে খুলবে জাদুঘরটি।’ 

এখানে কর্মরত জাতীয় জাদুঘরের কয়েকজন কর্মী জানান, জনবল নিয়োগ না হওয়ায় আপাতত জাতীয় জাদুঘরের ১৮ জন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এ জাদুঘরে কাজ করছেন। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নেওয়া হবে। এভাবেই আপাতত জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হবে।

৫ আগস্ট উদ্বোধন ও ৬ আগস্ট সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত : 

ছাত্র আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মিত জুলাই স্মৃতি জাদুঘর ৫ আগস্ট উদ্বোধন করা হবে। সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদুঘর উদ্বোধন করবেন। এরপরের দিন এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এই তথ্য নিশ্চিত করেন। 

এর আগে জাদুঘর উদ্বোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সময় চেয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ৫ আগস্ট উদ্বোধনের জন্য সময় দিয়েছেন। উদ্বোধনের পর এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে বলে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ : 

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত গণভবনের আয়তন ১৭ দশমিক ৬৮ একর। স্বাধীনতার পর প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান রাজধানীর মিন্টো রোডে প্রেসিডেন্ট ভবনে অফিস করতেন। প্রেসিডেন্ট ভবন তখন গণভবন নামে পরিচিত ছিল। ১৯৭৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও সচিবালয় হিসেবে শেরেবাংলা নগরে এই গণভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেখ হাসিনার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট থাকাকালে গণভবনে বসবাস না করলেও ভবনটিকে অফিসের কাজে ব্যবহার করতেন।

বিশাল কমপ্লেক্স, উন্মুক্ত মাঠসহ ২৯ হাজার বর্গফুটের দ্বিতল ভবনটিতে পরিবার নিয়ে থাকতেন সাবেক পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও দাফতরিক কাজও হতো এখানে। গণভবনের খোলা জায়গায় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল এমনকি বিভিন্ন জাতের ধানের চাষও করতেন শেখ হাসিনা। বিশাল লেকে মাছ চাষ করতেন। গরু, মুরগি, কবুতরসহ নানা জাতের পশুপাখি পালন করতেন। এ ছাড়া বিনোদনের জন্য ছিল বিশাল টেনিস কোর্ট।

জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’কে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ বা ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে’ রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার।

২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবনটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়। এরপর ৫ সেপ্টেম্বর জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য সিদ্ধান্ত নেয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। ২৪ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।

এর আগে ২০২৪ সালের ২ নভেম্বর জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বাস্তবায়নে লেখক ও গবেষক এবাদুর রহমানকে আহ্বায়ক করে ১৭ সদস্যের একটি কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটিকে জাদুঘরের নকশা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৭ থেকে ১৯ সদস্যের এই বিশেষজ্ঞ কমিটিতে স্থপতি, আলোকচিত্রী, গবেষক এবং ছাত্র প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ব্যয় : জানা যায়, এটি নির্মাণে গণপূর্ত বিভাগ ও জাতীয় জাদুঘর মোট বরাদ্দ পায় ১২৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। মোট খরচ হয় ১১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অব্যয়িত ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা সরকারের কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। জাদুঘর পরিচালনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

গণভবনের ক্ষতিগ্রস্ত মূল ভবন সংস্কারসহ পূর্ত ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামোগত কাজ করেছে গণপূর্ত অধিদফতর। আর ভাস্কর্য নির্মাণ, নিদর্শন সংগ্রহ ও শিল্পকর্ম কেনা, গ্যালারি সাজানো, তথ্য ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ শোভাবর্ধন এবং অফিস আসবাব ও সরঞ্জামাদি কেনার দায়িত্ব জাতীয় জাদুঘরের।

৯ জুলাই সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় আইন অনুযায়ী জাদুঘরের পর্ষদ পুনর্গঠন করে। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এ পর্ষদের সভাপতি হয়েছেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। জাদুঘরটির মহাপরিচালক সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

যা থাকছে জাদুঘরে : 

সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত গণভবনকে জুলাই বিপ্লব, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসনামলের স্মৃতি সংরক্ষণই এর মূল উদ্দেশ্য। জাদুঘরটিতে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, দুর্লভ দলিল, সংবাদপত্রের সংরক্ষিত প্রতিবেদন, আন্দোলনে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, শহিদ ও আহতদের ব্যক্তিগত স্মারক, পোশাক, ব্যানার, প্ল্যাকার্ডসহ নানা নিদর্শন স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া মাল্টিমিডিয়া ও ডিজিটাল ডিসপ্লের মাধ্যমে আন্দোলনের ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হবে। গবেষক ও দর্শনার্থীদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে তথ্যভিত্তিক আর্কাইভও।

জুলাই আন্দোলনে নিহতদের ছবি, শহিদদের স্মৃতিচিহ্ন, চিঠিপত্র, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, সংবাদপত্রের ক্লিপিং এবং অডিও-ভিডিও এখানে প্রদর্শিত হবে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের দৃশ্য ও স্বৈরাচারী শাসনের ভয়াবহতা তুলে ধরার বিশেষ স্থান থাকবে এই জাদুঘরটিতে।


সরকার সংশ্লিষ্টরা জানান, এই জাদুঘরে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনের ‘ফ্যাসিবাদ’, জুলাই বিপ্লবের ঘটনা, শহিদদের স্মৃতিচিহ্ন এবং গণঅভ্যুত্থানকালে বিক্ষোভকারীদের গণভবনে প্রবেশের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া বিগত সরকারের আমলে গুম, খুন ও আয়নাঘরের মতো নির্যাতনের চিত্রগুলো প্রদর্শিত হবে এখানে।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ক্ষমতায় থাকাকালে জানান, জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদদের ব্যবহৃত জিনিস স্মৃতি আকারে সংগ্রহ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে এটি শুরু হয়। এর জন্য বড় টিম তৈরি করা হয়েছিল। যারা দেশজুড়ে এই সংগ্রহের কাজটি করে। এ লক্ষ্যে কমিটি এবং অনেক সাব-কমিটি কাজ করেছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   প্রেসিডেন্ট ভবন  জুলাই স্মৃতি জাদুঘর  গণ-অভ্যুত্থান 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: