অভ্যুত্থানের সফলতা হচ্ছে হাসিনার মতো ফ্যাসিস্ট আর আসতে পারবে না

ফাইয়াজ উদ্দিন স্মরণ

জাতীয়

আব্দুল কাদের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক। আন্দোলনের সংকটময় সময়ে ঐতিহাসিক ৯ দফা দাবিনামা প্রণয়ন ও উপস্থাপনে

2026-08-05T03:28:12+00:00
2026-08-05T03:35:35+00:00
 
  বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
আব্দুল কাদেরের সাক্ষাৎকার
অভ্যুত্থানের সফলতা হচ্ছে হাসিনার মতো ফ্যাসিস্ট আর আসতে পারবে না
ফাইয়াজ উদ্দিন স্মরণ
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৩:২৮ এএম  আপডেট: ০৫.০৮.২০২৬ ৩:৩৫ এএম
আব্দুল কাদের। সংগৃহীত ছবি
আব্দুল কাদের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক। আন্দোলনের সংকটময় সময়ে ঐতিহাসিক ৯ দফা দাবিনামা প্রণয়ন ও উপস্থাপনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সময়ের আলোকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের নেপথ্যের নানা ঘটনা, ৯ দফা থেকে এক দফায় আসার প্রক্রিয়া, আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, অভ্যুত্থানের অর্জন, বর্তমান সরকারের ভূমিকা এবং নিজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ফাইয়াজ উদ্দিন স্মরণ


সময়ের আলো : জুলাই অভ্যুত্থানে যুক্ত হওয়ার পেছনে কারণটা কী ছিল? কোন মুহূর্তে মনে হয়েছিল এবার রাজপথে নামতেই হবে?

আব্দুল কাদের : দেখুন, প্রথম কথা হচ্ছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যুক্ত হওয়ার পেছনে কোনো স্পেসিফিক কারণ ছিল না। ২০১৯ সালে ক্যাম্পাসে আসার পর থেকে কিংবা আমি যখন ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হই, তখন থেকেই মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলার একটা আগ্রহ ভেতর থেকে ফিল করি। সে কারণেই আমি ক্যাম্পাসে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফর্মটাই তুলি। যদিও আমার মামা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফর্ম তুলে দেন। তবে অন্য কোথাও পরীক্ষা দিতে যাইনি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই চান্স পাই।

তখন থেকেই একটা চিন্তা করতাম। ২০১৯ সালে ক্যাম্পাসে ফার্স্ট ইয়ারে এসে তখন ছাত্রলীগের যে অন্যায়-অনিয়ম, যে দাসত্বের কালচারটা আছে- মানুষকে দাস হিসেবে ব্যবহার করা, মানুষ বা শিক্ষার্থীর মানবিক মর্যাদার জায়গাটা এখানে ন্যূনতম পূরণ করা হচ্ছে না- এই বিষয়গুলো নিয়ে আমি কাজ করতাম। যার জন্য বিভিন্ন সময় ক্যাম্পাসে হামলার শিকার হয়েছি। আমি একবার জেলেও গিয়েছি, জেল খেটেছি। যার কারণে আমার এক বছর গ্যাপও গেছে। সেখান থেকে বের হয়ে এই যে সিলসিলাটা, আমরা আমাদের জায়গা থেকে সবসময় অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলার জায়গাটা জারি রাখতাম। সেটারই ধারাবাহিকতায় জুলাই।

আপনি জানেন, জুলাইয়ে সবচেয়ে বড় যে অন্যায়ের জায়গাটা ছিল- কোটা ব্যবস্থা, যেটি একবার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সুরাহা হলো, সেটি আবার ২০২৪ সালের রিটের মধ্যে চলে এলো।

আমরা চেয়েছিলাম, এত বড় একটা অন্যায্য বিষয় শিক্ষার্থীদের ওপর করা হচ্ছে... শিক্ষার্থীদের অন্যায়ের জায়গা থেকে, তাদের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করার জন্য মূলত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। প্রথমত কোটা সংস্কার-পরবর্তী গণঅভ্যুত্থানের সময় তখন আরও বেশি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি চলে আসে।

৯ দফা তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে হয়েছিল?

৯ দফা তৈরির যে প্রক্রিয়াটা, সেটি হচ্ছে- আপনি জেনে থাকবেন, ১৯ জুলাই শুক্রবার। এর আগেই ১৭ তারিখ ক্যাম্পাস থেকে আমাদেরকে বের করে দেয়। ১৮ তারিখ আমরা একটা বাসায় ছিলাম- আমি, আসিফ ভাই, নাহিদ ভাই, বাকেরসহ। এরপর ১৮ তারিখ আমরা বাসা থেকে বের হয়ে আসি। তারপর তো আপনি জানেন, বিকালের মধ্যেই ইন্টারনেট শাটডাউন হয়ে যায়। তো ওই জায়গা থেকে পরে কোনো সিনিয়রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। 

এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জন চলছিল। পরে যখন খোঁজখবর নিলাম, তখন জানতে পারলাম যে, আমাদের কয়েকজন সমন্বয়ক সরকারের আহ্বানে আলোচনায় বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আপনি জেনে থাকবেন, সরকার তখন- যখন আবু সাঈদসহ ছয়জন শহিদ হয়- বারবার কিছু ফোর্স করছিল তাদের সঙ্গে বসার জন্য, আলোচনায় আসার জন্য। 

তখন আমরা শুনতে পারি যে, আমাদের মধ্যে কয়েকজন সমন্বয়ক সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওই জায়গায় আমরা মনে করলাম যে, এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনটা কোন দিকে যায়, সেটি নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। কারণ এর আগে আমাদের একটা অভিজ্ঞতা ছিল। আমাদের মধ্যে কয়েকজন সমন্বয়ক ১৬ তারিখে একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে দেয় অলরেডি যে, তারা সরকারের সঙ্গে বসতে চায়। প্রতিটি টিভি মিডিয়া সেটি প্রচার করে। যদিও আমরা মেইনস্ট্রিম জায়গা থেকে তখন আলোচনা করিনি যে, সরকারের সঙ্গে আমরা বসব কি বসব না। সেটি আমরা স্কিপ করে গিয়েছিলাম।

কিন্তু যখন শুনলাম যে কয়েকজন বসতে চাচ্ছে, তখন আমাদের মধ্যে একটা বিষয় তৈরি হয়। সেটির পরিপ্রেক্ষিতে, যেহেতু তৎকালীন সময়ে সিনিয়র কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি, তখন শিবিরের তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি ফরহাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। এরপর যোগাযোগ ও আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে এই ৯ দফাটা প্রণয়ন হয়।

কয়েকটা বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের তুমুল বাগবিতণ্ডা হয়। যেমন প্রথম দফা নিয়ে। তারা প্রথম দফায় প্রস্তাব করেছিল- প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। কিন্তু আমার জায়গা থেকে মনে হয়েছে, ওই সময় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কিংবা বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার ও রাজনৈতিক দল যারা আছে, তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়া প্রথম দফায় ‘শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে’- এ শব্দচয়নে আমি আগ্রহী ছিলাম না।

তো এই আলাপ-আলোচনার প্রেক্ষিতে অনেক পরে সিদ্ধান্ত হলো যে, ‘শেখ হাসিনাকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে’, যেটি ঘুরিয়ে বলা হলো আর কী। নিঃশর্ত ক্ষমা মানেই হচ্ছে- আপনার আর কোনো অধিকার নেই এই পদে আঁকড়ে ধরে রাখার।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে সাত নম্বর দফায় যেটি ছিল- ‘ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে’- যেটি শিবিরের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসে। তো আমি সে জায়গায় অপজিশনের স্ট্যান্ড নিই যে, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হলে তো আলটিমেটলি হাসিনার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন কিংবা শিক্ষার্থীদের অধিকারের জন্য যে আন্দোলন, সেটি তো অগ্রসর হতো না। তো সেটি অনেক আলোচনার পর্যায়ে গিয়ে একটা পর্যায়ে ‘লেজভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি’-তে এসে থামে। আর এভাবেই বেসিক্যালি ৯ দফাটা তৈরি হয়।

পরে কোন পরিস্থিতিতে ৯ দফা এক দফায় রূপ নিল?

আপনি দেখে থাকবেন, ৯ দফা তো আমরা প্রত্যেকটা সেক্টর ধরে প্রণয়ন করেছিলাম। ৯ দফার প্রথম দফা ছিল- যেহেতু মূল মাস্টারমাইন্ড শেখ হাসিনা। এখানে তিনি পুরো মানুষ হত্যার যে কারিগর কিংবা বিগত সময়ে মানুষের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ভোটাধিকার এবং প্রতিষ্ঠানগুলো হরণের সঙ্গে জড়িত- সে জায়গা থেকে প্রথমে শেখ হাসিনাকে ধরা হয়।

এরপর আপনি জেনে থাকবেন, আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও সরাসরি আমাদের ভিসি, প্রক্টরদের ইন্ধনেই কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হামলা চালানো হয়। এই হামলার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, ভিসি, প্রক্টর- তাদের পদত্যাগের দাবি তুলি। এটি কিন্তু ইন্টারনেট চালু থাকা অবস্থাতেই তোলা হয়েছিল।

এরপর বিভিন্ন পুলিশ প্রশাসনের কমিশনার যারা আছেন কিংবা পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্বশীল যারা আছেন, তাদের বিচার এবং পদত্যাগের দাবি- বিচার এবং পদত্যাগ, দুটিই আমরা দাবির মধ্যে ইনক্লুড করি।

আবার বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ কিংবা সরকার পক্ষের পেটোয়া বাহিনী, যারা পুলিশের সঙ্গে মিলেমিশে ছাত্রদের হত্যা করছে, তাদের সবাইকে ইনক্লুড করি। এরপর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টাও আমরা দাবির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করি।

তো এই জায়গাগুলোর কোনো সুরাহা সরকারের পক্ষ থেকে করা হচ্ছিল না। তারা কিন্তু বিনিময়ে আমাদের দাবিগুলোকে গুলির মুখ দিয়ে মোকাবিলা করছিল। আমাদের দাবিগুলো ছিল খুবই ন্যায্য। আমরা খুবই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু বিপরীত দিক থেকে সরকার বন্দুকের গুলির সামনে আমাদের এই ন্যায্য দাবিগুলোকে ডিল করছিল। তারা দাবিগুলো পূরণ করছিল না।


একটা পর্যায়ে যখন দেশের মানুষজনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কিংবা সরকারের অনড় অবস্থান, আর ন্যায্য দাবির বিপরীতে গুলি- এই অবস্থার সৃষ্টি হয়, তখন একটা পর্যায়ে গিয়ে সেটি এক দফায় পরিণত হয়। যে, না, এভাবে চলতে পারে না। ৯ দফা তো মানতে চায় না কিংবা কোনো সহজ সমাধানের পথও আসছে না। তা হলে এই সরকারের থাকার কোনো যোগ্যতা নেই।

যেহেতু আবার যে গভর্নমেন্ট, সেই গভর্নমেন্ট কোনো লিগ্যাল গভর্নমেন্ট না, সেটি বস্তুতই একটা অবৈধ গভর্নমেন্ট। সেটি মানারও কোনো কারণ নেই। শুধু সেটিই না, আমরা মনে করি, এক দফায় রূপান্তর হওয়ার পেছনে প্রতিটি স্টেকহোল্ডারের ভূমিকা ছিল। বুদ্ধিজীবী বলেন, শিল্পী সমাজ বলেন, শিক্ষক সমাজ বলেন কিংবা আপামর ছাত্র-জনতা- সবার যখন একটা ঐকমত্য আসে যে না, এই ব্যবস্থা চলতে পারে না, এই সরকার কিংবা এই খুনি হাসিনা চলতে পারে না, তখনই ৯ দফাটা এক দফায় পরিণত হয়।

এমন কোনো সিদ্ধান্ত আছে কি, যেটি এখন মনে হয় ভিন্নভাবে নেওয়া উচিত ছিল?

আমার মনে হয় না যে, জুলাইয়ে এমন কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেটি এখন নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আছে। আমার মনে হয়েছে, যুগোপযোগী সব সিদ্ধান্তই তৎকালীন সময়ে নেওয়া হয়েছে। পরে সেই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার কারণেই কিন্তু অভ্যুত্থানটা সফল হয়েছে।

কিন্তু সেই সিদ্ধান্তগুলো পরে আমরা দেখেছি, সেই জায়গা থেকে হয়তো বা অনেকে সরে আসছে। ৯ দফার আঙ্গিকে কাজ করতে চায়নি সরকার কিংবা তখনকার ইন্টারিম গভর্নমেন্ট কিংবা বর্তমান গভর্নমেন্ট। বিচারের যে জায়গাটা, সেটি নিশ্চিত করা হয়নি।

কিংবা একটা পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট- ক্যাম্পাস লেভেলে বলেন, রাজনৈতিক লেভেলে বলেন- একটা সুষ্ঠু সুরাহা হয়নি। এই বিষয়গুলো হয়নি। কিন্তু তৎকালীন সিদ্ধান্তগুলো সবই যথাযথ হয়েছে বলে আমি মনে করি।

আপনার মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন কী? মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, গত দুই বছরে তার কতটুকু পূরণ হয়েছে?

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেখেন, গণঅভ্যুত্থান হচ্ছে- আপনি সফল কি ব্যর্থ কিংবা সবচেয়ে সফল কিংবা সবচেয়ে ব্যর্থ- এই জায়গাটা আসলে স্পেসিফিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। এটি দীর্ঘদিন পরে বোঝা যায়।

যেমন দেখেন, আমি যদি স্পেসিফিকভাবে বলি, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে নব্বই আসলে আমাদের কী দিয়েছে? নব্বই আমাদের একটা জায়গা দিয়েছে। সবচেয়ে সফলতার জায়গা হচ্ছে, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর কোনো সামরিক শাসন বাংলাদেশের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সামরিক শাসন আসেনি।

আপনি ওয়ান-ইলেভেন বলেন, সেটিও কিন্তু ছিল সেনা-সমর্থিত, কিন্তু সরাসরি সেনাবাহিনী এখানে হস্তক্ষেপ করেনি। আমি মনে করি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটা সফলতা হচ্ছে- বাংলাদেশে হাসিনার মতো ফ্যাসিবাদ, ফ্যাসিজম ওই অর্থে একদম খুবই স্ট্রিক্টলি কখনোই আসতে পারবে না। 
আরেকটি বিষয় যদি আপনি দেখেন, দ্বিতীয়ত আমি যদি স্পেসিফিকভাবে বলি- জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের একটা বাক-স্বাধীনতা দিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের নতুন করে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটা সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে।

এতদিন আমরা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বলেন- সেই জায়গাগুলো প্রায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। রাষ্ট্রীয়করণ হয়ে যাচ্ছিল, দলীয়করণ হয়ে যাচ্ছিল। ওই জায়গাগুলো নিয়ে আমরা কথা বলতে পারতাম না- কীভাবে পরিবর্তন করা যায়, কীভাবে জনগণের মানবিক মর্যাদার জায়গাটা নিশ্চিত করা যায়।

একজন রিকশাচালক বলেন কিংবা অন্য ব্যক্তিরা বলেন কিংবা শ্রমিক বলেন- সে তার অধিকার নিয়ে কথাবার্তা বলতে পারত না। তো ওই জায়গায় আমার মনে হচ্ছে, একটি নতুন ধারার উন্মোচন হয়েছে। ক্যাম্পাসের পরিসরে দেখেন, ক্যাম্পাসে একটা মুক্তচর্চার কেন্দ্র তৈরি হয়েছে।

এই জায়গায় বাধা-বিপত্তি অবশ্যই আছে। দমন-পীড়ন, প্রগতিশীলদের দমিয়ে রাখা- এগুলো আছে। তবু আমার মনে হচ্ছে, ৫ আগস্টের আগের তুলনায় এখন একটা স্পেস তৈরি হয়েছে। এটি একটি সফল জায়গা, আপনি বলতে পারেন।

আপনার মতে, বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী? বর্তমান সরকার কি এখনও জুলাইয়ের জনআকাক্সক্ষার প্রতিনিধিত্ব করছে, নাকি সেই পথ থেকে সরে এসেছে?

বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে- আমার মনে হয়েছে, বর্তমান সরকারপ্রধান কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী। যেটি আমরা বিগত সরকারপ্রধানদের মধ্যে চরিত্রে কিংবা অ্যাক্টিভিজমের মধ্যে দেখিনি। তিনি একটা স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আসছেন। জনবান্ধব বলেন কিংবা দলীয়বান্ধব- এমন কিছু নয়, তিনি একটা স্বাধীনতা নিয়ে এসেছেন। তার আচার-আচরণে সেটি বোঝা যায়। এটি বর্তমান সরকারের মধ্যে একটা আশার জায়গা।

আর দুর্বলতা হচ্ছে, বর্তমান সরকার কিন্তু হচ্ছে- আগের যে বিষয়টা আমরা দেখেছি, আমরা কিন্তু এক দফার মধ্যে বলছিলাম যে, শুধু হাসিনার পতন নয়; ফ্যাসিবাদী যে ব্যবস্থা, সেই ব্যবস্থার পতন।

কিন্তু এখন আমাদের সমাজের অন্তর্দ্বন্দ্ব বেড়ে গেছে। আমি ছোট্ট একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা বুঝতে পারবেন। চট্টগ্রামে কয়েক দিন আগে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরীর মধ্যে জলাবদ্ধতা কেন হয়েছে, সেটি জানেন? বিগত কোনো সময়ে আপনার যে নালা আছে, রাস্তার পাশে যে ম্যানহোল আছে- এসবের ওপরে কোনো দোকান বসানো হয়নি। কিন্তু এখন প্রত্যেকটা নালার ওপরে, ম্যানহোলের ওপরে দোকান বসানো হচ্ছে। দোকানের সব বর্জ্য আবার ম্যানহোলের মধ্যে ফেলা হচ্ছে। সবকিছু নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।


এই কাজগুলো কেন হয়েছে? আবারও চাঁদাবাজির একটা উৎস তৈরি করা হয়েছে। পুরো সবকিছু দখল করে দোকানপাট দখল করা, নতুন করে দোকান বসানো- সব জায়গায় চাঁদাবাজির যে বিষয়টা, প্রত্যেকটা জায়গায়, প্রত্যেকটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে- একদম তৃণমূল থেকে সেন্ট্রাল পর্যন্ত- এই চাঁদাবাজির জায়গাটা এখন মানুষের জন্য জিম্মির কারণ হয়ে আছে। এটি ব্যর্থতার একটা জায়গা।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, মানুষজন আগে আওয়ামী লীগের কাছে জিম্মি ছিল। এখন হচ্ছে বর্তমান সরকারের তৃণমূল পর্যায়ের যে নেতাকর্মী, তাদের কাছে মানুষ জিম্মি হয়ে যাচ্ছে।

আর হচ্ছে, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার যে বিষয়টা, সেটি সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। আমরা কিন্তু অভ্যুত্থানের সময় মানুষের জান ও মালের নিরাপত্তা চেয়েছিলাম। আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ছিল অন্যতম একটা বাসনা।

জনসাধারণ একটা নিরাপদ জীবনযাপন করতে চায়। সে তার জীবনের নিরাপত্তা চায়, সম্পত্তির নিরাপত্তা চায়। সে কীভাবে নিরাপদ জীবনযাপন করবে- ওই জায়গাটা নিশ্চিত করা যায়নি।

আবার আরেকটা বিষয় ধরেন, একটা রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো ঘটনা ঘটবে, কোনো অপরাধ ঘটবে। কিন্তু সেই অপরাধকে সরকার কীভাবে ডিল করছে, সেটি সমাধান করতে পারছে কি না সেই চেষ্টা কতটুকু- সেটিও আমরা দেখিনি। কিন্তু আমরা দেখছি, বিএনপি আসার পর নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে, দোকানপাট দখল নিয়ে, চাঁদাবাজি নিয়ে নিজেরা নিজেরা মারামারি করছেন। আবার দেখেন, তারা নিজেরা মারামারি করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ তাদের গুলিতে মারা যাচ্ছে। 

এই যে জনজীবন একটা হুমকির মুখে- এটি সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার জায়গা বিএনপির জন্য। কারণ মানুষ আওয়ামী লীগের সময় যেমন গোলাগুলি হতো, যেমন মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতো, জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল- সেই নিরাপত্তার জায়গাটা নিশ্চিত করা যায়নি। এটি ব্যর্থতার একটা জায়গা।

আপনাকে ধন্যবাদ।

সময়ের আলোকে‌ও ধন্যবাদ।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   অভ্যুত্থান  হাসিনা  ফ্যাসিস্ট  সাক্ষাৎকার  আব্দুল কাদের  গণ-অভ্যুত্থান 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: