দিনের পর দিন আন্দোলন ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ভেতর দিয়ে এই জাতি পেয়েছে ৫ আগস্টের স্মরণীয় দিন, হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে এক নতুন বাংলাদেশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা দ্বিধার জন্ম হয়েছে, এটা কি সত্যিই গণ মানুষের আন্দোলন ছিল, নাকি কেবলই মেটিকুলাস ডিজাইনের শিকার হয়েছিল সবাই?
এই দ্বিধার সূত্রপাত মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বক্তব্য থেকে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে তিনি ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভের এক অনুষ্ঠানে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মাহফুজ আলমকে পুরো আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। একই অনুষ্ঠানে তিনি আন্দোলনকে ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইনড’ বলেও উল্লেখ করেন।
শহরের দেয়ালে জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি। ছবি : সময়ের আলো
যোগাযোগ প্রযুক্তির এই যুগে বক্তব্যটি দ্রুত দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের মনে তখন প্রশ্ন জাগে- একটি আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ কীভাবে নির্ধারিত হলো? কারণ আন্দোলনের পুরো সময়জুড়ে সাধারণ ধারণা ছিল, এটি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষোভ, গণতন্ত্রের সংকট এবং সরকারের বিরুদ্ধে জমে থাকা জনঅসন্তোষের বিস্ফোরণ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সেই ক্ষোভকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আন্দোলনটি কেবল ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; শিক্ষক, শ্রমিক, পেশাজীবীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নিয়েছিলেন।
সেই জায়গা থেকেই প্রশ্ন ওঠে, একটি সর্বজনীন গণ-অভ্যুত্থানকে কীভাবে একজন ব্যক্তির পরিকল্পনার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়? আবার ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছিল? যদি এটি পরিকল্পিত হয়, তবে সেই পরিকল্পনার নেপথ্যে কারা ছিলেন- ছাত্রনেতারা, ড. ইউনূস, নাকি অন্য কোনো শক্তি?
জুলাই মাসের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আন্দোলনের শুরু থেকে মূল দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কার। মাসজুড়ে আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি, সংঘর্ষ এবং বিবৃতিতে সরকার পতনের আনুষ্ঠানিক দাবি দেখা যায় না। বরং সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ, বিশেষ করে আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক ভুল পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়।
এ ধরনের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা সরকারের জন্য নতুন ছিল না। ২০১৮ সালেও কোটা সংস্কার আন্দোলনের মুখোমুখি হয়েছিল সরকার। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে শুরুতেই আলোচনার পথ বেছে নেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু ক্ষমতার আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সরকার পতনের এক দফা দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকে। একই দিন অনির্দিষ্টকালের অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। যদিও ২ আগস্ট ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি, উত্তরাসহ কয়েকটি স্থানে শেখ হাসিনার পদত্যাগের স্লোগান শোনা গিয়েছিল, সেগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন। তা আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নেয় ৩ আগস্টের সমাবেশেই।
আগস্টের শুরুতেই সরকারও পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করে। ১ আগস্ট জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। একই দিনে ডিবি হেফাজতে থাকা ৬ ছাত্রনেতাকে রিমান্ড ছাড়াই মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেকে সরকারের নমনীয় হওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখেন। কিন্তু তখন আন্দোলন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বের বহু গণ-আন্দোলনের মতো এখানেও দেখা যায়, সরকার যখন দেরিতে আলোচনার উদ্যোগ নেয়, তখন আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। ৩ আগস্টের পর সরকার ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করলেও, তারা তা প্রত্যাখ্যান করে সরকার পতনের দাবিতে অনড় থাকেন। এ সময় কোটা সংস্কারের প্রশ্নটি আন্দোলনের মূল ইস্যু থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়। তখন আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণও শুধু ছাত্রনেতাদের হাতে ছিল না। ডিবি কার্যালয়ে বসে কয়েকজন ছাত্রনেতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও আন্দোলন থেমে যায়নি। বরং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে তা আরও বিস্তৃত হয়। আন্দোলনের গতি তখন জনসম্পৃক্ততার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল, কোনো একক নেতৃত্বের ওপর নয়।
এই বাস্তবতার সঙ্গে ‘মাস্টারমাইন্ড’ কিংবা ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ ধারণার মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সরকার পতনের পর আন্দোলনের কৃতিত্ব একজন ব্যক্তি বা একটি পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। এতে একটি সর্বজনীন গণ-আন্দোলন নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে, একদিকে আন্দোলনের সম্মিলিত অর্জনের ব্যাখ্যা বদলে গেছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সমর্থকদেরও এই দাবি করার সুযোগ তৈরি হয়েছে যে, ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ ছিল জনগণের আন্দোলন নয়, বরং একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র!