জুলাই আন্দোলনে নিহতদের স্বজনদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল দ্রুত বিচার। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতিতে হতাশা বাড়ছে। একইসঙ্গে বৈষম্য, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও নিরাপত্তাহীনতার মতো সমস্যাগুলো এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন শহিদ পরিবারের সদস্যরা।
জুলাইয়ের প্রথম শহিদ, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, ‘বৈষম্যের বিরুদ্ধে জীবন দেওয়ার পরও দেশে এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। দ্রুত বিচারই ছিল আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, কিন্তু দুবছর পার হলেও বিচার দৃশ্যমান নয়।’
রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে ১৮ জুলাই গুলিতে নিহত হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল (বিইউপি)-এর এমবিএ শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে তার আত্মত্যাগ আন্দোলনকে আরও বেগবান করে এবং ‘পানি লাগবে, পানি’ স্লোগানটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘তার ছেলে এমন একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, যেখানে দলাদলি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, অন্যায় ও অত্যাচারের স্থান থাকবে না।’ তিনি মনে করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার ও রায়ের বাস্তবায়ন না হলে শহিদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন হবে না।
ধানমন্ডির ৩ নম্বর সড়কে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সরকারি বাসভবনের সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়।
তার বাবা আবু হেনা মোস্তফা জামান বলেন, ‘একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তিনি এককালীন ১ লাখ টাকা এবং মাসিক ৫ হাজার টাকা ভাতা পান। সেই সামান্য সহায়তা নিয়েই এখন রংপুরে জীবনযাপন করছেন।’
আন্দোলনে গুলিতে নিহত প্রথম নারী শহীদ নাঈমা সুলতানার বাবা-মাও বিচার না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, ঘটনার ভিডিও ও বিভিন্ন আলামত থাকা সত্ত্বেও বিচার কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। একইসঙ্গে সরকার ঘোষিত আর্থিক সহায়তার একটি অংশের প্রক্রিয়াও দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে রয়েছে।
অন্যদিকে, শাহবাগে গুলিতে নিহত শিক্ষার্থী গোলাম নাফিজের বাবা গোলাম রহমান বলেন, ‘তার ছেলে এমন বাংলাদেশের জন্য জীবন দেয়নি, যেখানে এখনো খুন, চাঁদাবাজি ও সহিংসতা চলবে।’
১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ঢাকা টাইমসের সাংবাদিক মেহেদি হাসান। তার ভাই জাহিদ হাসান আশিক বলেন, ‘নিহত মেহেদির ২ ছোট সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবার গভীর উদ্বেগে রয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কিংবা জুলাই ফাউন্ডেশন- কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই তাদের পরিবার এখনো আর্থিক সহায়তা পায়নি।
শনির আখড়ায় নিহত ইউসুফ সানোয়ারের বোন বিউটি বেগমের অভিযোগ, শুরুতে অনেকেই পাশে থাকলেও এখন আর কেউ খোঁজ নেন না। বিচার আদৌ হবে কি না, তা নিয়েও তিনি শঙ্কিত। একই অভিযোগ শহিদ পরিবারের আরও অনেকের। তাদের ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জুলাই ফাউন্ডেশন ঘোষিত আর্থিক সুবিধা বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক দফা অসহযোগ কর্মসূচির দিনে সিলেটের গোলাপগঞ্জে সংঘর্ষে নিহত হন নাজমুল, সানি, তাজউদ্দীন, মিনহাজ, গৌছ উদ্দীন, জয় আহমদ ও কামরুল ইসলাম পাভেল।
পাভেলের বাবা রফিক উদ্দিন বলেন, ‘তার ছেলে ছিলেন পবিত্র কোরআনের হাফেজ এবং অত্যন্ত নিরীহ।’ মামলা করলেও এখনো বিচার পাননি, বরং অনেক আসামি ইতোমধ্যে বিদেশে পালিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একই ধরনের হতাশা বিরাজ করছে বগুড়ার শহিদ জুনাইদ ইসলাম রাতুলের পরিবারেও। পুলিশের গুলিতে নিহত ষষ্ঠ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর পরিবার এখনো গভীর শোক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। শহীদ পরিবারগুলোর অভিন্ন দাবি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও ঘোষিত আর্থিক সহায়তা দ্রুত বাস্তবায়নেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
সময়ের আলো/মহু