জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে গাইবান্ধায় শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ঘিরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। অনুষ্ঠানে এনসিপি নেতাকর্মীদের উপস্থিতির সময় ‘এনসিপি বয়কট’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে জুলাই যোদ্ধাদের একটি অংশের সঙ্গে এনসিপি সমর্থকদের বাগ্বিতণ্ডা, ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুরে গাইবান্ধা জেলা ইনডোর স্টেডিয়ামে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠান চলাকালে এনসিপির কয়েকজন নেতাকর্মী ইনডোর স্টেডিয়ামে প্রবেশ করলে উপস্থিত জুলাই যোদ্ধাদের একটি অংশ প্রথমে ফ্যাসিবাদবিরোধী স্লোগান দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে জুলাই যোদ্ধা শরিফুল ইসলাম আকাশ ‘এনসিপি বয়কট’ স্লোগান দিলে তার সঙ্গে আরও কয়েকজন সুর মেলান। এতে এনসিপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা আপত্তি জানালে উভয় পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছে যায়। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষকে সরিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। তবে এ ঘটনায় কেউ আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জুলাই যোদ্ধা শরিফুল ইসলাম আকাশ বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে কেউ অসম্মানজনক আচরণ করলে আমরা নীরব থাকব না। আজ আমাদের অসম্মান করা হয়েছে বলেই আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি এবং এই স্লোগান দিতে বাধ্য হয়েছি।
অন্যদিকে এনসিপির গাইবান্ধা জেলা আহ্বায়ক খাদেমুল ইসলাম খুদি বলেন, যারা এনসিপি বয়কটের স্লোগান দিয়েছে, তারা হয়ত কোনো ক্ষোভ বা অভিমান থেকেই তা দিয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশে যে কেউ শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশ বা স্লোগান দিতে পারে। তবে এমন পরিস্থিতি আমরা প্রত্যাশা করি না।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভিন্ন অংশীজন এবং কয়েকজন জুলাই যোদ্ধার মধ্যে এনসিপির স্থানীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম ও নেতৃত্ব নিয়ে আগে থেকেই কিছু মতপার্থক্য ও অসন্তোষ ছিল। আজকের ঘটনাটি সেই বিরোধের বহিঃপ্রকাশ বলেই সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হয়। সকাল ১০টায় গাইবান্ধা পৌর পার্কে জুলাই শহিদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সূচনা হয়। সেখানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা, জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক, পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দীনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য এবং জুলাই যোদ্ধারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
পরে ইনডোর স্টেডিয়ামে আলোচনা সভা, শহিদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং সম্মাননা স্মারক বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আবুল কাওছার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এমপি। এছাড়া বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা, জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক, পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দীন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল আলম সাকাসহ জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য, জুলাই যোদ্ধা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতৃবৃন্দ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন এস এম শাওন।
বক্তারা ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধারা দ্রুত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের রায় কার্যকরের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শেষে জেলার ছয়টি জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য এবং ২৪৬ জন জুলাই যোদ্ধার হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রত্যেককে একটি করে গাছের চারা বিতরণ করা হয়।
সময়ের আলো/জোই