পাবনার বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ থেকে নগরবাড়ী পর্যন্ত যমুনা নদীর অংশটি একসময় ছিল মিঠাপানির গাঙ্গেয় ও ইরাবতি ডলফিন বা শুশুকের অবাধ বিচরণক্ষেত্র। তবে বর্তমানে এই মহাবিপন্ন প্রাণীটি বিলুপ্তির পথে।
দেশের অন্যতম বড় মোহনগঞ্জ-নগরবাড়ী শুশুক অভয়ারণ্যটি এখন চরম সংকটে রয়েছে। নদীতে কারেন্ট জালের ব্যবহার, নৌযান চলাচল, নদী দখল ও অপরিকল্পিত ঘাট নির্মাণের কারণে শুশুকের স্বাভাবিক চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে এই নিরীহ স্তন্যপায়ী প্রাণীটির সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর মোহনগঞ্জ থেকে নগরবাড়ী পর্যন্ত ৪০৮.১১ হেক্টর এলাকা নিয়ে শুশুক অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। পাবনায় বর্তমানে তিনটি শুশুক অভয়ারণ্য রয়েছে পার্শ্ববর্তী সাঁথিয়া উপজেলার সেলুন্দা-নাগডেমড়া (২৪.১৭ হেক্টর), বেড়া উপজেলার নাজিরগঞ্জ (১৪৬ হেক্টর) ও মোহনগঞ্জ-নগরবাড়ী। এর মধ্যে আয়তন ও শুশুকের সংখ্যায় মোহনগঞ্জ-নগরবাড়ী সবচেয়ে বড়।
তবে অভয়ারণ্য ঘোষণার এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেখানে নেই কোনো সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, ব্যানার বা সচেতনতামূলক কার্যক্রম। স্থানীয়রা জানান, অভয়ারণ্য এলাকায় কোনো কার্যকর নজরদারি নেই।
সম্প্রতি ৬ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে এক জেলের কারেন্ট জালে ধরা পড়ে একটি ১২০-১৪০ কেজি ওজনের শুশুক মারা যায়, যা পরবর্তী সময়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য ঘোরানো হয়। তবুও কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম (বাবু) বলেন, আগে মোহনগঞ্জ ঘাট এলাকায় সতর্কীকরণ ব্যানার ও সাইনবোর্ড ছিল, এখন কিছুই নেই। এই নিরীহ প্রাণীর অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতে হলে কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
জেলে আবু সাঈদ বলেন, আমি ৩০ বছর ধরে যমুনা নদীতে মাছ ধরি, কিন্তু কখনো জানতে পারিনি এটা শুশুক অভয়ারণ্য। আগে নদীতে প্রায়ই দেখা যেত, এখন খুব কম দেখা যায়। আমাদের মাঝে শুশুক রক্ষায় কোনো সচেতনতা নেই।
বনপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ রাজশাহীর বন্যপ্রাণী পরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর কবির জানান, নদীর নাব্যতা হ্রাস, দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে শুশুকের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। অভয়ারণ্য ঘোষণার পরও সেখানে মাঠপর্যায়ে তদারকির জন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। শিগগিরই মাঠপর্যায়ে শুশুক রক্ষায় কার্যক্রম শুরু করা হবে।
তিনি আরও জানান, শুশুক বা ডলফিন হত্যা, পাচার বা ক্রয়-বিক্রয় করা বনপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
পরিবেশবিদদের মতে, মোহনগঞ্জ-নগরবাড়ী অভয়ারণ্যটি রক্ষা করতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি-নতুবা শিগগিরই নদী থেকে বিলুপ্ত হবে মিঠাপানির শুশুক।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে