৫ বছরে জুমের জমি কমেছে ৫৪ শতাংশ, অনিশ্চয়তায় ভবিষ্যৎ

খাগড়াছড়ি সংবাদদাতা

সারাদেশ

খাগড়াছড়ির পাহাড়ে জুম ধান কাটার মৌসুমে ব্যস্ত সময় পার করছেন জুমিয়ারা। পাহাড়ের ঢালে ঢালে পাকা ধান ঘরে তোলার প্রস্তুতি চলছে।

2026-10-03T23:46:03+00:00
2026-10-03T23:46:03+00:00
 
  রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬,
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
৫ বছরে জুমের জমি কমেছে ৫৪ শতাংশ, অনিশ্চয়তায় ভবিষ্যৎ
খাগড়াছড়ি সংবাদদাতা
প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৪৬ পিএম 
পাহাড়ের ঢালে সোনালি ফসল কাটায় ব্যস্ত জুমিয়ারা। ছবি : সময়ের আলো
খাগড়াছড়ির পাহাড়ে জুম ধান কাটার মৌসুমে ব্যস্ত সময় পার করছেন জুমিয়ারা। পাহাড়ের ঢালে ঢালে পাকা ধান ঘরে তোলার প্রস্তুতি চলছে। কোথাও ধান কাটা হচ্ছে, কোথাও চলছে মাড়াই ও ফসল সংগ্রহ। তবে এই ব্যস্ততার আড়ালে রয়েছে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের ক্রমসংকোচনের চিত্র। একদিকে জুমে এ বছর ভালো ফলনের খবর পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে চাষের জমি কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহে এই কৃষি পদ্ধতি টিকে থাকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে খাগড়াছড়িতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর পাহাড়ে জুম চাষ হয়েছিল। চলতি বছরে চাষের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৫০ হেক্টরে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে জুম চাষের জমি কমেছে ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর বা প্রায় ৫৪ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান পাহাড়ের প্রচলিত কৃষিব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জুমচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জমির স্বল্পতা, পাহাড়ে বসবাসের ঘরবাড়ি সম্প্রসারণ, ফলজ বাগান গড়ে তোলা এবং কৃষিকাজের খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক পরিবার আগের মতো জুম চাষ করতে পারছে না। যারা এখনও এ পেশায় যুক্ত রয়েছেন, তাদেরও উৎপাদন খরচ ও শ্রমিকের মজুরি নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সীমানাপাড়ার জুমচাষি মিলন ত্রিপুরা বলেন, তিনি এ বছর তিন হাঁড়ি জুম ধান চাষ করেছেন। তবে আগের তুলনায় এখন ফলন কমে গেছে। ফসল উৎপাদনে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় লাভ বাড়েনি। 

তিনি আরও বলেন, আমার নিজস্ব জমি নেই। জুম চাষ করে ৩০-৩৫ মণ ধান পাই। কিন্তু এখন সার দিতে হয়, কীটনাশক দিতে হয়। সব মিলিয়ে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সেই তুলনায় লাভ হয় না। ছেলেমেয়েরাও জুম চাষে আসতে চায় না।

মরাটিলার চাষি শান্তি ত্রিপুরা জানান, এ বছর তাদের এলাকায় জুম ধানের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু ভালো ফলন হলেও চাষের পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। তার ভাষ্য, মরাটিলায় এ বছর হাতেগোনা কয়েকজন জুম চাষ করেছেন।

শান্তি ত্রিপুরার মতে, গত কয়েক বছরে ওই এলাকায় জনবসতি বেড়েছে। অনেক পাহাড় ব্যক্তি মালিকানাধীন দখল হওয়ায় ঘরবাড়ি ও ফলজ বাগান গড়ে উঠেছে। ফলে জুম চাষের জন্য আগের মতো খালি পাহাড় পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট। সব মিলিয়ে জুম চাষ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

খাগড়াছড়ির পাহাড়ে জুম চাষ কমে যাওয়ার পেছনে ভূমির ব্যবহার পরিবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আগে যে পাহাড়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর জুম চাষ করা হতো, তার অনেক জায়গায় এখন ঘরবাড়ি, ফলজ বাগান কিংবা বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে উঠছে।

পাহাড়ের ঢালে ফলজ বাগান স্থাপন অনেকের কাছে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের একটি উপায়। বিশেষ করে যাদের জমি ও বিনিয়োগের সামর্থ্য রয়েছে, তারা ফলজ বাগানের দিকে ঝুঁকছেন। অন্যদিকে জুম চাষের জন্য জমি ও শ্রমের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর পক্ষে এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হচ্ছে।

আলুটিলার চন্দ্র কিরণ চাকমা জানান, এখনও পাহাড়ের অনেক পরিবার জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল। জুমে শুধু ধান নয়, ভুট্টা, তিল, কাউন, মারফা, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন করা হয়। তার মতে, জুমচাষিদের সরকারি সহযোগিতা বাড়ানো গেলে এই কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলো উপকৃত হতে পারে।

জুম চাষে একাধিক ফসল উৎপাদনের ফলে পরিবারের খাদ্য চাহিদা পূরণে সহায়তা পাওয়া যায়। ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন শস্য ও সবজি চাষের মাধ্যমে খাদ্য তালিকায় বৈচিত্র্য আসে। কিন্তু চাষের জমি কমে গেলে এই বহুমুখী উৎপাদনের সুযোগও সংকুচিত হয়। ফলে বিষয়টি শুধু ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে পাহাড়ি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকার প্রশ্নও জড়িত।

জুম চাষ কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ শ্রমিকের অভাব। পাহাড়ের ঢালে জমি প্রস্তুত করা, বীজ বপন, আগাছা পরিষ্কার, ফসলের পরিচর্যা, ধান কাটা ও মাড়াই প্রতিটি ধাপেই শ্রমের প্রয়োজন হয়। কিন্তু কৃষিকাজের ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ বাড়ায় অনেকেই জুম চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন।

বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ আর পূর্ব পুরুষের এই পেশায় যুক্ত হতে আগ্রহী নয়। অনিশ্চিত আয়, পরিশ্রমের তুলনায় কম লাভ এবং জমির সংকট তাদের অন্য পেশার দিকে যেতে উৎসাহিত করছে। 

এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে জুম চাষের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। পাহাড়ের মাটি, ঢাল, বৃষ্টিপাত ও ফসলের ধরন বিবেচনা করে জুম চাষের সময় নির্ধারণ এবং বিভিন্ন ফসলের সমন্বয় করার অভিজ্ঞতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে উঠেছে। নতুন প্রজন্ম এই পেশা থেকে দূরে সরে গেলে সেই অভিজ্ঞতার চর্চাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে ফলজ বাগান বেড়ে যাওয়ায় জুম চাষের জমি কমছে। জুমে ধান উৎপাদন বাড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের পক্ষ থেকে এ বছর চাষিদের পাঁচ কেজি করে ধানের বীজ এবং ২০ কেজি করে রাসায়নিক সার দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) পক্ষ থেকেও বীজ দেওয়া হয়েছে। ব্রি ধান-৮৩, বিনা ধান-১৯ ও বিনা ধান-২১ জাতের ধানবীজ জুমে চাষ হয়েছে। তার মতে, এ বছর তিনটি জাতেরই ভালো ফলন হয়েছে। ধারাবাহিক বৃষ্টিপাতও ফলন ভালো হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে। তিনি আরও জানান, জুমে আধুনিক জাতের ফসল উৎপাদনে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছেন।

তবে উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগের পাশাপাশি জুম চাষের জমি কমে যাওয়ার কারণগুলো মোকাবিলা করাও জরুরি। উন্নত বীজ ও সার দিয়ে প্রতি হেক্টরে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলেও চাষের জমি ক্রমাগত কমতে থাকলে সামগ্রিক উৎপাদন এবং এই পেশার সঙ্গে যুক্ত পরিবারের সংখ্যা বাড়ানো কঠিন হবে।

খাগড়াছড়িতে পাঁচ বছরের ব্যবধানে জুম চাষের জমি প্রায় ৫৪ শতাংশ কমে আসার তথ্য এই পরিবর্তনের ব্যাপকতা তুলে ধরে। এ বছর ভালো ফলন হলেও জমি ও শ্রমের সংকটের কারণে জুমচাষিরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী এই কৃষিব্যবস্থা কতটা টিকে থাকবে, তা নির্ভর করবে চাষিদের জীবিকা, জমির ব্যবহার এবং কৃষি সহায়তা— এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করার ওপর।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   জুম  জমি  শতাংশ  অনিশ্চয়তা  ভবিষ্যৎ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: