কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর হাত ধরে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা এই প্রথম এআই ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন এবং পরীক্ষাগারে সফলভাবে বংশবিস্তার করতে সক্ষম এমন জীবন্ত ভাইরাস তৈরি করেছেন।
বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটিকে জিনোম ডিজাইনে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং মারাত্মক জৈবনিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
গবেষণায় ইভো-১ ও ইভো-২ নামের শক্তিশালী এআই মডেল ব্যবহার করা হয়, যেগুলোকে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ ও মানুষের জিনগত তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই মডেলগুলোকে এমনভাবে উন্নত করা হয়, যাতে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করতে সক্ষম ‘ব্যাকটেরিওফাজ’ ভাইরাসের জিনোম তারা তৈরি করতে পারে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ব্রায়ান হাই জানান, জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে কোষের ভেতরে প্রবেশ করে বংশবিস্তার করতে পারে— এমন কোনো সম্পূর্ণ জিনোম তৈরির ঘটনা এটাই প্রথম। গবেষক দল এআইয়ের তৈরি ৩০২টি নতুন নকশা পরীক্ষাগারে বাস্তবায়ন করেন। এর মধ্যে ১৬টি ভাইরাস সফলভাবে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।
গবেষক দলের আরেক সদস্য স্যামুয়েল কিং জানান, পেট্রি ডিশে ব্যাকটেরিয়ার স্তরের মাঝে পরিষ্কার ধ্বংসের দাগ দেখার পরই তারা নিশ্চিত হন যে কৃত্রিমভাবে তৈরি এই ভাইরাসগুলো সফলভাবে কাজ করছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রযুক্তির সুফল সুদূরপ্রসারী। ভবিষ্যতে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো কাজ করতে ব্যর্থ হলে, অর্থাৎ অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই ফাজ থেরাপি এক বিপ্লব ঘটাতে পারে।
ম্যানচেস্টার ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির অধ্যাপক প্যাট্রিক কাইয়ের মতে, এই সাফল্য প্রমাণ করে যে এআই জিনোমের বিবর্তনগত ভাষা বুঝতে শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে কৃত্রিম জীববিজ্ঞানে নতুন যুগের সূচনা করবে। স্পেনের অধ্যাপক মার্ক গুয়েল একে বিজ্ঞানের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সাফল্যের পাশাপাশি এই গবেষণাটি বিশ্বজুড়ে জৈবনিরাপত্তা (বায়োসেফটি) এবং জৈব সুরক্ষা (বায়োসিকিউরিটি) সংক্রান্ত তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক থমাস ইংলসবাই ও মরিটজ হ্যাঙ্কে সতর্ক করে বলেছেন, মূল প্রশ্ন এখন আর এআই দিয়ে জিনোম তৈরি করা সম্ভব কি না, তা নয়; বরং এই প্রযুক্তি যেন ভবিষ্যতে মানবজাতি বা অন্য জটিল প্রাণীর জন্য বড় কোনো বিপর্যয় ডেকে না আনে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। তারা মানব বা জটিল প্রাণীকে সংক্রমিত করতে পারে— এমন কোনো ভাইরাস তৈরির গবেষণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
অবশ্য গবেষক দলের দাবি, নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তারা এমন কোনো ভাইরাসকে এআইয়ের প্রশিক্ষণের ডেটায় রাখেননি যা মানুষ বা প্রাণীর ক্ষতি করতে পারে। এ ছাড়া পুরো গবেষণাটি অত্যন্ত কঠোর ও উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন পরীক্ষাগারে সম্পন্ন করা হয়েছে।
ব্রায়ান হাইয়ের মতে, বর্তমান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার বজায় রাখতে সক্ষম। তা সত্ত্বেও, বিজ্ঞানের এই যুগান্তকারী অর্জন বিপ্লব নাকি মানবতার জন্য এক মারাত্মক বিপদ হয়ে দেখা দেবে— তা নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে উৎকণ্ঠা কাটছে না।
সময়ের আলো/জেডি