দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লাখ লাখ মানুষ বছরের পর বছর ধরে নাগরিক অধিকারের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সেই দাবি আজও বাস্তবায়ন হয়নি।
রোববার (৯ আগস্ট) আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে কমলগঞ্জে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো ফের ভূমিসহ সব ধরনের নাগরিক অধিকার এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন।
বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাহাড় ও সমতলে ৫০টির বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে বসবাস করছে। এর মধ্যে শুধু কমলগঞ্জেই মণিপুরী, খাসিয়া, ত্রিপুরা, গারো, ওঁরাওসহ ২১টির বেশি সম্প্রদায়ের প্রায় ২ লাখ মানুষ রয়েছেন।
নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে বসবাস করলেও তারা সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সবচেয়ে বড় সংকট ভূমির অধিকার না থাকা। শিক্ষার জন্য সরকারি বিদ্যালয় নেই। চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও নাজুক। ভূমির অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পাহাড় ও টিলায় ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।
সিলেট আদিবাসী ফোরামের নেতারা জানান, জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন করা হয়। আমাদের দেশে দিবসটি বেসরকারিভাবে পালন করি। সরকারিভাবে আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ফলে, তারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের কো-চেয়ারপারসন ও মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যান জিডিসন প্রধান সুচিয়াং বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছি, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আমাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলা হয়। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি, আমাদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক ও সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হোক।’
খাসিয়া সম্প্রদায়ের সাজু মারচিয়াং বলেন, ‘শত বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করলেও, এখনো ভূমির অধিকার নিশ্চিত হয়নি। অনেক পুঞ্জিতে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। শিক্ষার কোনো সরকারি ব্যবস্থা নেই। বেশিরভাগ মানুষ পাহাড়ে পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। খাসিয়াপাড়াগুলোতে বিশুদ্ধ পানিরও সংকট রয়েছে।’
চা-শ্রমিক সন্তান দিনেশ বাউরি বলেন, ‘এই সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম চা শ্রমিক। চা বাগানে বহু আদিবাসী কাজ করেন। তবে, তারা সবকিছু থেকে বঞ্চিত। কাগজে-কলমে বাংলাদেশি নাগরিক হলেও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। ভূমির অধিকার ও মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানালেও তা বাস্তবায়ন হয় না। কর্মসংস্থানের অভাবে হাজার হাজার চা শ্রমিক বেকারত্ব নিয়ে ঘুরছেন।’
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, ‘আদিবাসীরা শিক্ষা, চিকিৎসা, ভূমির অধিকার ও মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বাড়াতে হবে। চা শ্রমিকসহ সব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দিতে হবে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘আদিবাসীরা দেশের নাগরিক। তাদের অবশ্যই ভূমির অধিকার দেওয়া প্রয়োজন। শুধু ভূমি নয়, সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত। শত শত বছর ধরে তারা বসবাস করছেন, অথচ আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি মেলেনি।’
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক তানভীর হোসেন বলেন, ‘আদিবাসীরা আমাদের কাছে কোনো দাবি জানায়নি। তারা যদি দাবি জানায়, তাহলে তা সরকারের কাছে পৌঁছে দেব।’
সময়ের আলো/মহু