কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির শুমারিতে সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী পদে নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফলে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, জাতীয় পার্টি ও স্বামী-স্ত্রীর নামসহ অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে।
প্রকাশিত তালিকায় একাধিক ইউনিয়নের একই ওয়ার্ডের চারজনকে নির্বাচিত করা, একই পরিবারের সদস্য ও স্বামী-স্ত্রীর নাম থাকা, এক ব্যক্তির নাম দুই ক্রমিকে রাখা, এক ইউপির প্রার্থীকে অন্য ইউপিতে সুপারভাইজার পদে চূড়ান্ত করা, এক পদের প্রার্থীকে আরেক পদে নিয়োগ দেওয়া এবং ভাইবা পরীক্ষায় মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকার অভিযোগ করেছেন ভাইবায় উত্তীর্ণ শত শত প্রার্থী।
রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে নাগেশ্বরী উপজেলা পরিষদের নোটিশ বোর্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী পদে ১৬৮জন, অপেক্ষমাণ ৭৭জন ও সুপারভাইজার পদে ১৭ জন, এপদে অপেক্ষমাণ ৩জনকে নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুই ধাপে দুই পদে প্রায় চার হাজার আবেদন জমা হয়। পরে যাচাই বাছাই শেষে দুই ধাপে (প্রায়) তিন হাজার পাঁচশত জন প্রার্থীর পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। তবে, দুই পদে কতজনকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে এর সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য উপজেলা সমাজ সেবা কার্যালয় থেকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে সমাজসেবা কর্মকর্তা জামাল হোসেন বলেন, আপনি অফিসে আসেন, সরাসরি বলবো। ফোনে বলা যাবেনা বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন তিনি। তবে ভাইবা বোর্ড থাকা উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপসহকারী প্রকৌশলী ফিরোজ কবীর জানান, দুই ধাপে প্রায় তিন হাজার পাঁচশত জন প্রার্থী ভাইবা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।
এদিকে প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা পর্যালোচনা করে জানা যায়, পাঁচটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির লোকজন নিয়োগে স্থান পেয়েছে। উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন তালিকায় (ক্রমিক নং ৩৭) ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, বেরুবাড়ী ইউনিয়নে (ক্রমিক নং ৬৭) ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, নেওয়াশী ও সন্তোষপুর ইউনিয়নে ছাত্রলীগকর্মী এবং পৌরসভায় জাতীয় পার্টির ছাত্রসমাজের নাম থাকার অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে বামনডাংগা ও কালীগঞ্জ ইউনিয়ন সুপারভাইজার পদের জন্য অন্য ইউনিয়ন থেকে আওয়ামী লীগ পরিবার ও সমর্থক প্রার্থীকে চূড়ান্ত তালিকায় রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কালীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রুহুল আমিন বলেন, আমি এ ইউনিয়নের সুপারভাইজার পদে পরীক্ষা দিয়েছি, ভাইবায় পাস করেছি। অথচ, আমাকে না রেখে বেরুবাড়ী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ পরিবারের একজনকে সুপারভাইজার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি অবিচার। বিগত সতের বছর কালীগঞ্জ ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ও যুবদলের সহ-সাঃসম্পাদক পদের জন্য অনেক অত্যাচার-নির্যাতন সইতে হয়েছে। আজ বিএনপি সরকারের সময়েও নিজের প্রতি এ বৈষম্য কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
তালিকায় দেখা গেছে, বামনডাংগা ইউনিয়নের নয়টি ওয়ার্ডের মধ্যে তিনটি ওয়ার্ড ফাঁকা রেখে একটি ওয়ার্ড থেকেই চারজনকে নেওয়া হয়েছে। রায়গঞ্জ (ক্রমিক নং ১৬ ও ১৮), নুনখাওয়া (ক্রমিক নং ১৪২ ও ১৪৩) ও কালীগঞ্জ ইউনিয়ন (ক্রমিক নং ৮৫ ও ৮৬) সহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের একই পরিবার থেকে একাধিক ও স্বামী-স্ত্রীকে তালিকায় তথ্য সংগ্রহকারী পদে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া কচাকাটা ইউনিয়নের ধনিরামপুর গ্রামের লিসা মনি খাতুনের নাম তথ্য সংগ্রহকারী পদে চূড়ান্ত তালিকায় দুটি ইউনিয়নে পাওয়া গেছে। কেদার ইউপি'র ১৬০ ও কচাকাটা ইউপি'র ৩৩ নং ক্রমিকে।
প্রার্থী মূল্যায়ন পদ্ধতির বিষয়ে জানতে চাইলে ভাইবা বোর্ডে থাকা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, যারা পাস, তাদের পাস এবং যারা ফেল, তাদের ফেল দেখানো হয়েছে। কোনো নম্বর দেওয়া হয়নি। আমরা সংকেত ব্যবহার করেছি। তবে ওই সংকেতের ভিত্তিতে কীভাবে প্রার্থীদের চূড়ান্তভাবে পাস-ফেল নির্ধারণ করা হয়েছে এবং মূল্যায়নের নির্দিষ্ট মানদণ্ড কী ছিল এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
নিয়োগের ফলাফল ও অভিযোগকে কেন্দ্র করে উপজেলা বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যেও ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। এবিষয়ে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজা বলেন, আমরা সমাজ সেবায় অভিযোগ দিয়ে তাদের নাম প্রত্যাহারের চেষ্টা করবো।
অভিযোগের বিষয়ে নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলাউদ্দিনকে দুপুর ২টা ৫৭ মিনিট থেকে বিকাল ৪টা ৪৯ মিনিট পর্যন্ত তিন দফা মোবাইলে ফোনে করলে জানান, তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন। পরে কল ব্যাক করবেন। এদিকে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত প্রশ্ন পাঠালেও রাত ১০টা ৫ মিনিট পেরিয়ে গেলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
সময়ের আলো/জোই