চৌদ্দ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার পা রেখেছিলেন তাসকিন আহমেদ। বয়স তখন মাত্র ১৮। সেই সফরে তরুণ ট্রাভিস হেডকে আউট করার স্মৃতিও আছে তার। এরপর কেটে গেছে এক যুগেরও বেশি সময়। বদলেছে সময়, বদলেছে দুই দলের অবস্থান, বদলেছে তাসকিনের ভূমিকাও। এবার সেই হেডই যখন ডারউইনে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের অন্যতম বড় ভরসা, তখন নতুন বল হাতে তার সামনে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় তাসকিন। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট প্রত্যাবর্তনের মঞ্চে পুরোনো সেই গল্পই যেন নতুন অধ্যায়ের জন্ম দিতে যাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের মাটিতে বাংলাদেশের সর্বশেষ টেস্ট সিরিজ হয়েছিল ২০০৩ সালে। তখন তাসকিন ছিলেন মাত্র আট বছরের শিশু। হয়তো টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছিলেন বাংলাদেশের সেই সফর। দুই যুগেরও বেশি সময় পর এবার সেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই নিজ দেশের টেস্ট জার্সিতে মাঠে নামার অপেক্ষায় তিনি। ‘আমরা সত্যিই সম্মানিত যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলতে পারছি। কোনো সন্দেহ নেই, অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট খেলা আমাদের প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য গর্বের মুহূর্ত। সিরিজটি আমাদের জন্য সহজ হবে না। তারপরও আমরা আসন্ন সিরিজে ভালো করার আশা করছি।’
অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাসকিনের সম্পর্ক অবশ্য আজকের নয়। ২০১২ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তার প্রথম বড় ক্রিকেট অভিজ্ঞতা। এরপর ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ এবং ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও খেলেছেন এই দেশে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তার অভিষেকও হয়েছে ১২ বছর আগে, মিরপুরে টি-টোয়েন্টিতে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অপেক্ষাটা এতদিন থেকেই গেছে।
এবার সেই অপেক্ষার অবসান। আর প্রতিপক্ষ দলে থাকবেন তার শৈশবের দেখা একঝাঁক নায়ক। ‘ছোটবেলা থেকেই আমি অস্ট্রেলিয়া দলের খেলোয়াড়দের, বিশেষ করে তাদের গ্রেট ফাস্ট বোলার ও কিংবদন্তি ক্রিকেটারদের দেখে আসছি। এখন তাদের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পেয়েছি। তাই আমি সত্যিই রোমাঞ্চিত।’ শুধু প্রতিপক্ষ হিসেবেই নয়, অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের কাছ থেকেও শেখার আগ্রহ তাসকিনের। স্টার্ক, হ্যাজলউড, কামিন্স কিংবা বোল্যান্ড, যাদের খেলা নিয়মিত দেখেছেন, এবার তাদের সঙ্গেই একই মাঠ ভাগ করবেন তিনি।
‘অস্ট্রেলিয়া আমার বোলিংয়ের জন্য প্রিয় জায়গা। আমি সবাইকে দেখে আসছি, স্টার্ক, হ্যাজলউড, কামিন্স, এমনকি বোল্যান্ডও ভালো করছে। সুযোগ পেলে তাদের সঙ্গে অবশ্যই কথা বলতে চাই।’ তবে রোমাঞ্চের পাশাপাশি বাস্তবতাটাও পরিষ্কার। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলার সুযোগ বাংলাদেশের সামনে খুব বেশি আসে না। তাই এই সিরিজে প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগানোর তাগিদও প্রবল। ঘরের মাঠে মাত্র দুই মাস আগে অস্ট্রেলিয়াকে ২-১ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজে হারিয়েছে বাংলাদেশ। মিরপুরের সেই সিরিজে গতি ও বাউন্সে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের পরীক্ষা নিয়েছিল বাংলাদেশের পেস আক্রমণ।
সেই জয় তাসকিনদের আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। তবে তিনি জানেন, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গল্পটা আলাদা, ‘ওই সিরিজটি আমাদের জন্য সত্যিই দারুণ ছিল। ঐতিহ্যগতভাবে মিরপুরে উইকেট ধীর ও স্পিনসহায়ক হলেও শেষ সিরিজে বেশ ভালো ক্রিকেটীয় পরিবেশ ছিল। আমরা সবাই ভালো খেলেছি এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জিতেছি। এটি আমাদের অনেক আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে। তবে ঘরের মাঠ আর দেশের বাইরে খেলার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে।’
সেই পার্থক্যের কঠিন বাস্তবতার খানিকটা দেখা গেছে প্রস্তুতি ম্যাচেই। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ২৬৩ রান করলেও দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। ম্যাচ হারে ইনিংস ও ৩৮ রানে। মাত্র ২২ বছর বয়সি ক্যাম্পবেল থমসন ২৫ রানে নেন ৮ উইকেট। অস্ট্রেলিয়া একাদশের হয়ে টিগ উইলি করেন ১৩০ রান।
তাসকিন স্বীকার করেছেন প্রস্তুতি ম্যাচের ফল স্বস্তির ছিল না, ‘প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারের পর অনুভূতিটা ভালো ছিল না। তবে ক্রিকেটে এমন হয়। আমরা এখনও কন্ডিশন ও উইকেটের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। ম্যাচটি ভালো প্রস্তুতি ছিল। আমরা হেরেছি ঠিকই, কিন্তু মূল ম্যাচে ভালো করার আশা করছি।’
বাংলাদেশের সেই হারকে অবশ্য খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চান না ট্রাভিস হেড। প্রস্তুতি ম্যাচের ফল দিয়ে মূল টেস্টের চিত্র আঁকা ঠিক হবে না বলেই মনে করেন তিনি, ‘বছরের পর বছর আমিও কিছু বেশ খারাপ প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছি। এগুলো সবসময় কঠিন, কারণ আপনার মন সম্ভবত অন্য জায়গায় থাকে। বাংলাদেশ দলের কিছু খেলোয়াড়ও শুধু বৃহস্পতিবারের ম্যাচ এবং সেখানে কী করতে হবে, সেটি নিয়েই ভাবছিল।’
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ২৬৩ রান করার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন হেড, ‘তারা প্রথম ইনিংসে ভালো খেলেছে, ২৭০-এর কাছাকাছি রান করেছে। তাই তারা ফলাফল নিয়ে অবশ্যই হতাশ হবে, বাইরে থেকে দেখলেও বিষয়টি এমনই মনে হবে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা শুধু বৃহস্পতিবারের ম্যাচ নিয়েই ভাববে।’
ডারউইনের মাঠে নতুন বল হাতে তাসকিন বনাম হেড, বাংলাদেশের ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত দ্বৈরথগুলোর একটি। একসময় যে অস্ট্রেলিয়াকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখে বড় হয়েছেন তাসকিন, এবার সেই দলের ব্যাটারদেরই সামনে দাঁড়িয়ে বল হাতে নিজের গল্প লেখার পালা। আর সামনে যদি থাকেন ১৪ বছর আগের সেই পরিচিত মুখ ট্রাভিস হেড, তাহলে এই প্রত্যাবর্তনের গল্পটি আরও একটু বিশেষ হয়ে যেতেই পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে