নিজের জন্য একটু সময়

তাসলিমা নীলু

ফিচার

সকাল ৬টায় অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে সবার বিছানায় যাওয়া পর্যন্ত একজন নারীর সারা দিনের জীবন যেন

2026-08-12T12:24:45+00:00
2026-08-12T12:50:54+00:00
 
  রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬,
২ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
ফিচার
নিজের জন্য একটু সময়
তাসলিমা নীলু
প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৪ পিএম  আপডেট: ১২.০৮.২০২৬ ১২:৫০ পিএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
সকাল ৬টায় অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে সবার বিছানায় যাওয়া পর্যন্ত একজন নারীর সারা দিনের জীবন যেন একটা অবিরাম দৌড়। সংসার, সন্তান, ক্যারিয়ার কিংবা স্বজনদের যত্ন- সব দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে দিনের শেষে থমকে দাঁড়ানোর মতো শক্তিও যেন অবশিষ্ট থাকে না। সমাজ আমাদের ছোটবেলা থেকেই শেখায়, অন্যের যত্ন নেওয়াই নারীর প্রধান সার্থকতা। কিন্তু এ সবকিছুর মাঝে একটি অত্যন্ত মৌলিক প্রশ্ন আড়ালেই থেকে যায়, ‘নারী নিজের যত্ন নিচ্ছেন তো?’

অন্যের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে নিজের শারীরিক ও মানসিক চাহিদাকে গুরুত্ব না দেওয়ার এই অভ্যাস ধীরে ধীরে ক্লান্তি, অবসাদ এবং আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করতে পারে। তাই ব্যস্ততার মাঝেও নিজের জন্য কিছু সময় বের করে নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের অপরিহার্য অংশ।

একজন নারীর জীবনে ‘নিজের জন্য কিছু সময়’ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার এবং মানসিকভাবে সুস্থ থাকার একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।

আমাদের সমাজে নারীদের ছোটবেলা থেকেই দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়। ভালো মেয়ে, ভালো স্ত্রী, ভালো মা কিংবা ভালো কর্মী হওয়ার চেষ্টায় তারা প্রায়ই নিজের ইচ্ছা, শখ ও বিশ্রামকে পেছনে ঠেলে দেন। অথচ একজন মানুষ তখনই অন্যকে ভালো রাখতে পারেন, যখন তিনি নিজেও ভালো থাকেন।

আমাদের সমাজে আত্মত্যাগকে নারীর বড় গুণ হিসেবে দেখা হয়। ‘সবাই খেয়ে নিলে তারপর আমি খাব’ কিংবা ‘সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আমি বিশ্রাম নেব’- এই মানসিকতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। কিন্তু ক্রমাগত নিজের চাওয়া-পাওয়া, ক্লান্তি এবং আবেগকে চেপে রেখে অন্যের জন্য কাজ করে গেলে একসময় মানসিক ও শারীরিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক।

দীর্ঘদিনের এই মানসিক চাপ থেকেই জন্ম নেয় বিষণ্নতা, খিটখিটে মেজাজ এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা। একটি গাড়ির জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে যেমন তা আর চলতে পারে না, তেমনি নিজের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক জ্বালানি না থাকলে অন্য কারও যত্ন নেওয়াও শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয় না।

নিজের জন্য সময় মানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবসর নয়। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট নিজের পছন্দের কোনো কাজে ব্যয় করাও হতে পারে আত্মযত্নের সুন্দর শুরু। কেউ বই পড়তে ভালোবাসেন, কেউ গান শোনেন, কেউ হাঁটতে বের হন, আবার কেউ ছবি আঁকা, বাগান করা বা ডায়েরি লেখায় আনন্দ খুঁজে পান। এসব ছোট ছোট অভ্যাস মনকে সতেজ রাখে এবং নতুন উদ্যমে কাজ করার শক্তি জোগায়।

দীর্ঘদিন নিজের অনুভূতিকে উপেক্ষা করলে মানসিক চাপ বাড়ে। এর প্রভাব ঘুমের সমস্যা, খিটখিটে মেজাজ, কর্মক্ষমতা হ্রাস এমনকি পারিবারিক সম্পর্কেও পড়তে পারে। তাই আত্মযত্নকে স্বার্থপরতা নয়, প্রয়োজন হিসেবে দেখা উচিত।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. রাশেদুল হক বলেন, ‘অনেক নারী মনে করেন, নিজের জন্য সময় বের করলে তারা দায়িত্বে অবহেলা করছেন। বাস্তবে বিষয়টি ঠিক উল্টো। নিয়মিত নিজের জন্য কিছু সময় রাখলে মানসিক চাপ কমে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে এবং পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে আরও ইতিবাচকভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয়।’

ব্যাংক কর্মকর্তা  তামান্না রশিদ বলেন, ‘আত্মযত্ন শুরু হয় নিজের প্রয়োজনকে স্বীকার করার মাধ্যমে। প্রতিদিন অল্প সময় হলেও মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থেকে নিজের পছন্দের কোনো কাজে মন দেওয়া মানসিক সুস্থতার জন্য খুবই উপকারী। অপরাধবোধ ছাড়াই নিজের জন্য সময় নেওয়া প্রয়োজন।’

নিজের জন্য সময় বের করার ক্ষেত্রে পরিবারের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। সংসারের দায়িত্ব শুধু একজনের নয়। পরিবারের অন্য সদস্যরা যদি কাজ ভাগ করে নেন, তা হলে নারীরাও কিছুটা অবসর পান। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রেও কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ব্যস্ত জীবনে নিজের যত্ন নেওয়ার কয়েকটি সহজ উপায় হতে পারে দিনের শুরুতে ১০ মিনিট নীরবে বসে থাকা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, পছন্দের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা সপ্তাহে অন্তত এক দিন নিজের ভালো লাগার কোনো কাজ করা। ছোট ছোট এই উদ্যোগই মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

নারীর পরিচয় শুধু দায়িত্ব পালনেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একজন স্বতন্ত্র মানুষ, যার স্বপ্ন আছে, অনুভূতি আছে, বিশ্রামেরও প্রয়োজন আছে। তাই অন্যের জন্য সময় দেওয়ার পাশাপাশি নিজের জন্যও প্রতিদিন কিছুটা সময় বরাদ্দ করা উচিত। কারণ একজন সুখী, মানসিকভাবে সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী নারীই পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারেন।

সময়ের আলো/আআ
  বিষয়:   ফিচার  লাইফস্টাইল  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: