সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজার-টেকনাফ হাইওয়ে মহাসড়কের টেকনাফ ও উখিয়া অংশে মাটিবাহী ডাম্পারসহ ভারী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। দ্রুতগতিতে ওভারটেকিং, অদক্ষ চালকের গাড়ি চালানো এবং নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভারী যান চলাচলের কারণে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বুধবার (১২ আগস্ট) হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কেরুনতলী এলাকায় বালুবাহী ডাম্পারের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী ২ যুবক নিহত হয়েছেন। টেকনাফের গিলাতলী এলাকার মোহাম্মদ আরমান চৌধুরী ও উখিয়ার পালংখালী এলাকার মো. রুবেল মোটরসাইকেলে করে যাওয়ার সময় বেপরোয়া গতির একটি ডাম্পারের ধাক্কার শিকার হলে দুজনই মারা যান।
এছাড়া, তিন মাস আগে হ্নীলা ১ নম্বর ওয়ার্ড মৌলভীবাজার আলী আকবর পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা ৭ বছর বয়সী আল মামুন নামে এক শিশু মাটিকাটার ড্রাম্প ট্রাকের ধাক্কায় বাঁ পায়ে গুরুতর আঘাত পান। বর্তমান শিশুটি ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর ডাম ট্রাকের মালিক চিকিৎসার খরচ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তীতে টাকা না পেয়ে আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে টাকা ধার করে শিশুটির চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে পরিবার।
এ বিষয়ে ড্রাম্প ট্রাকের মালিকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিশুটির চিকিৎসাবাবদ ৪ ধাপে টাকা দেওয়া হয়েছে। ১১ আগস্টে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। আহত শিশুর চিকিৎসার সকল খরচ বহন করে যাব।’
এর আগেও এই মহাসড়কে ডাম্পারের ধাক্কায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইক্যংয়ের খারাংখালী এলাকায় বেপরোয়া গতির ডাম্পারের চাপায় ৬ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, টেকনাফ-কক্সবাজার মহাসড়কে অনেক ডাম্পার ও ভারী যানবাহন নিয়ম না মেনে দ্রুতগতিতে চলাচল করে। বিশেষ করে বালু পরিবহনকারী ডাম্পারগুলো ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেক করায় বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনগুলোকে প্রায়ই বিপদের মুখে পড়তে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মহাসড়কটি টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজারের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন। তাই ভারী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের দাবি, অবৈধ বা কাগজপত্রবিহীন যানবাহন শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া, চালকদের লাইসেন্স যাচাই, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি বাড়াতে হবে।
সড়ক ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডাম্পার ও ভারী যানবাহনের গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ, চালকদের প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের দিয়ে ডাম্পার চালানোর অভিযোগও রয়েছে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই অনেক চালক বেপরোয়া গতিতে ডাম্পার চালাচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে, টেকনাফ- কক্সবাজার মহাসড়কে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
এ বিষয়ে টেকনাফ হোয়াইক্যং হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ নুরুল আবসার জানান, অবৈধ ডাম্পার ও নিয়ম না মেনে গাড়ি চালানো চালকদের বিরুদ্ধে হাইওয়ে পুলিশের অভিযান শুরু হয়েছে। মহাসড়কে বেপরোয়া ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে ডাম্পার চলাচল কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
তিনি ডাম্পার মালিকদের সতর্ক করে বলেন, ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক কিংবা বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন কোনো ব্যক্তির হাতে গাড়ি তুলে দেওয়া যাবে না। মালিকরা এসব নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট চালকের পাশাপাশি গাড়ির মালিককেও আসামি করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সড়কে শৃঙ্খলা ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাইওয়ে পুলিশের অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে।’
এ বিষয়ে টেকনাফ হোয়াইক্যং হাইওয়ে থানার পক্ষ থেকে মহাসড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সকলের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। একইসঙ্গে ডাম্পার মালিক, চালক ও সংশ্লিষ্টদের আইন মেনে গাড়ি পরিচালনা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক ও লাইসেন্সবিহীন ব্যক্তির হাতে গাড়ি না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সড়কে দুর্ঘটনা রোধ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চালক, মালিক, যাত্রী ও সাধারণ জনগণকে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ।
সময়ের আলো/মহু