মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার জন্য ইরান পরিকল্পনা করছে— গত এক বছরে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একাধিক সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব তথ্যের কিছুই স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বর্তমান এক মার্কিন কর্মকর্তা ও সাবেক দুই কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে ট্রাম্পকে স্নাইপারের মাধ্যমে গুলি করে হত্যা কিংবা বড় কোনো জনসমাবেশে ছুরি দিয়ে হামলার জন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সম্ভাব্য পরিকল্পনার কথাও ছিল। ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের আগে থেকেই এসব সতর্কতা আসতে শুরু করে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এসব সতর্কবার্তা আরও জোরালো হয়।
তবে সবচেয়ে বিস্তারিত সতর্কবার্তাটি আসে গত জুলাইয়ে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের আগে। ওই সময় ইসরায়েলি কর্মকর্তারা হোয়াইট হাউসকে জানান, এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে সম্মেলনে যাওয়ার পথে ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে ইরান। এমনকি কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে তার উড়োজাহাজে হামলার আশঙ্কার কথাও জানানো হয়।
ট্রাম্পের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্কতামূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। এর মধ্যে তুরস্ক সফরের সময় একটি ব্যতিক্রমী নিরাপত্তা কৌশলও নেওয়া হয়। তুরস্ক থেকে ফেরার পথে ট্রাম্পকে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে অন্য একটি উড়োজাহাজে সরিয়ে নেওয়া হয়।
তবে ওই হুমকির বিষয়ে ইসরায়েলের দেওয়া তথ্যের পক্ষে কোনো প্রমাণ পায়নি তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও। দেশটির এক কর্মকর্তা জানান, ইসরায়েলের দাবির সত্যতা যাচাই করার মতো কোনো তথ্য তাদের হাতে ছিল না। বিষয়টি তারা মার্কিন কর্মকর্তাদেরও জানিয়েছিল।
ইরানের সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে ২০২০ সালে হত্যার প্রতিশোধ নিতে ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে ইরান— এমন আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তবে গত বছরের শুরু থেকে ইসরায়েল যেসব নির্দিষ্ট হুমকির তথ্য দিয়েছে, তার কিছু স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।
তারপরও সতর্কতার অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউস ও ট্রাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সিক্রেট সার্ভিস এসব হুমকি মোকাবিলায় বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘটনা ইরান বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের প্রভাবের বিষয়টি সামনে এনেছে। একই সঙ্গে ইরানের হুমকি নিয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নের মধ্যকার পার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও মতপার্থক্য
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা মূল্যায়নে পার্থক্য রয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করেছিল, ইরান সক্রিয়ভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজ করছে না। তবে ইসরায়েল তখনও তেহরানকে জরুরি হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছিল।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এমন মূল্যায়ন থাকা সত্ত্বেও ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। এর আগে ইরান তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে— ইসরায়েলের কাছ থেকে পাওয়া এমন গোয়েন্দা তথ্যও তার সিদ্ধান্তে বিবেচনায় ছিল বলে এর আগে জানিয়েছিল রয়টার্স। তবে ইসরায়েলি দূতাবাসের একজন মুখপাত্র অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ইরাননীতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে— এমন দাবি ভিত্তিহীন।
হোয়াইট হাউস ও সিআইএ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। সিক্রেট সার্ভিসের মুখপাত্র অ্যান্থনি গুগলিয়েলমিও নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক হত্যাচেষ্টা ও হুমকি বেড়ে যাওয়ার পরও প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সংস্থাটির প্রধান অগ্রাধিকার।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য?
মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে ইরানসংক্রান্ত বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে আসছে।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানসংক্রান্ত ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য সাধারণত আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে সিআইএ বা ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির কাছে পৌঁছায়। এরপর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সেগুলো বিশ্লেষণ করে। তবে ইসরায়েলের কাছ থেকে পাওয়া সব তথ্য মার্কিন গোয়েন্দারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেন না। অন্যান্য উৎসের তথ্য মিলিয়ে এসব গোয়েন্দা তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক অভিযানের সময়ও ইরানের হুমকি নিয়ে ইসরায়েলের দেওয়া কিছু গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে সিআইএর মূল্যায়ন ছিল ‘কম আস্থার’। এর মধ্যে ট্রাম্পকে হত্যার সম্ভাব্য পরিকল্পনার তথ্যও ছিল বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়েছে। সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, গত বছর ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালকের কার্যালয়ের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার পর সিআইএ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের সঙ্গে যৌথ মূল্যায়নের কাজ বন্ধ করে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণী সংস্থা ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য একত্র করে বৃহত্তর গোয়েন্দা মূল্যায়ন তৈরিতে সংস্থাটি কাজ করে। সাম্প্রতিক সময়ে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালকের কার্যালয়ে কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণেও ইরান নিয়ে এই কাউন্সিলের মূল্যায়নের সংখ্যা কমেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সময়ের আলো/কেএইচ