ইসরায়েলে খ্রিষ্টানদের ওপর হয়রানির ঘটনা বাড়ায় উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন দেশটির খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সদস্যরা। দৃশ্যমান ধর্মীয় পরিচয় তাদের হয়রানির ঝুঁকিতে ফেলতে পারে— এমন আশঙ্কায় অনেকে এখন বিশ্বাস ও স্থানীয় মিত্রদের ওপর ভরসা করছেন। দেশটির জনসংখ্যার ২ শতাংশেরও কম খ্রিষ্টান। অঞ্চলজুড়ে চলমান একাধিক সংঘাতের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে হয়রানির ঘটনা বেড়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তধর্মীয় সংগঠন।
জেরুজালেমের পুরোনো শহরের কাছে কাজ করতে যাওয়ার সময় মেক্সিকান ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী সিস্টার মায়েলার সঙ্গে এখন একজন ইহুদি স্বেচ্ছাসেবক থাকেন। এর আগে একই এলাকায় আরেক ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী হামলার শিকার হওয়ার পর তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সিস্টার মায়েলা বলেন, আগে তিনি তুলনামূলক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলাফেরা করতে পারতেন। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে এবং তিনি সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করেই চলছেন।
সম্প্রতি একদল অতি-রক্ষণশীল ইহুদির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক কিশোর তার পেছনে থুতু ফেলেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। কিশোরটি অবশ্য দাবি করে, সে শুধু গলা পরিষ্কার করছিল। পরে ঘটনাটি পুলিশকে জানান সঙ্গে থাকা স্বেচ্ছাসেবক।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর ইসরায়েল আবারও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে দেশটিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ বেড়েছে। এর প্রভাব খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপরও পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেরুজালেমে খ্রিষ্টানদের হয়রানির ঘটনা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা রিলিজিয়াস ফ্রিডম ডেটা সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, চার বছর আগের তুলনায় সাম্প্রতিক তিন মাসে শহরটিতে খ্রিষ্টানদের হয়রানির ঘটনা প্রায় তিন গুণ হয়েছে। এখন প্রায় প্রতিদিনই এমন একটি ঘটনা নথিভুক্ত হচ্ছে। এসব ঘটনার প্রায় সবই ইহুদি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
এপ্রিল মাসে এক ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনীর ওপর হামলার ঘটনায় অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি বসতির এক ইহুদি ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
খ্রিষ্টানদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনায় উদ্বেগের মধ্যে ইসরায়েল সরকারও পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। সম্প্রতি দেশটির সরকার খ্রিষ্টান বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ দূত হিসেবে গ্রিক অর্থোডক্স খ্রিষ্টান জর্জ দেককে নিয়োগ দিয়েছে।
দেক বলেন, খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে প্রতিটি ঘটনা অনৈতিক ও বেআইনি এবং এসবের বিচার হওয়া উচিত। ইসরায়েল এমন একটি দেশ হিসেবে থাকতে চায়, যেখানে খ্রিষ্টানরা শুধু টিকে থাকবে না, বরং নিরাপদে উন্নতি করতে পারবে।
সম্প্রতি খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি ঘটনায় আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দা জানানো হয়। এর মধ্যে এক ইসরায়েলি সেনার একটি পরিবারের বাগানে থাকা ক্রুশ ভেঙে ফেলা এবং আরেক সেনার দক্ষিণ লেবাননে ভার্জিন মেরির একটি মূর্তির মুখে সিগারেট গুঁজে দেওয়ার ঘটনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দুই সেনাকে সামরিক কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তবে গবেষকদের মতে, ইহুদি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীদের একটি অংশ এখনো খ্রিষ্টানদের জন্য হুমকি হয়ে আছে।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতও খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মধ্যকার উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। কারণ ইসরায়েল ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের অধিকাংশ স্থানীয় খ্রিষ্টানই ফিলিস্তিনি।
পশ্চিম তীরের সর্বশেষ সম্পূর্ণ খ্রিষ্টান অধ্যুষিত গ্রাম তাইবেহেও সাম্প্রতিক সময়ে ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে বাড়ির বেড়া কেটে দেওয়া এবং ফল ও সবজির বাগান নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় ক্যাথলিক গির্জার যাজক বাসার ফাওয়াদলেহ বলেন, গ্রামের মানুষ ভয়ে আছেন এবং বসতিস্থাপনকারীরা প্রতিদিন সেখানে আসা-যাওয়া করছেন। হামলা ঠেকাতে চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এলাকাটিকে সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ঘোষণা করেছে।
এমন পরিস্থিতিতেও অনেক খ্রিষ্টান নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি উত্তর ইসরায়েলের মাউন্ট তাবোরে যিশুর রূপান্তর উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত তীর্থযাত্রায় অংশ নেন বহু ক্যাথলিক।
নাজারেথ থেকে আসা ২০ বছর বয়সী জন আকলেহ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে খ্রিষ্টান হিসেবে নিজেদের পরিচয় ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এটিই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তীর্থযাত্রায় অংশ নেওয়া রেভারেন্ড ফাদি শাল্লুফি বলেন, সামনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। তবে একদিন এই ভূমিতে পরিবর্তন আসবে— এই বিশ্বাস নিয়েই তারা এগিয়ে যাচ্ছেন।
সময়ের আলো/কেএইচ