ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীভুক্ত এক নারীর সাথে দীর্ঘদিনের পরকীয়ার বীভৎস বলি হয়েছেন শেরপুরের ঝিনাইগাতি উপজেলার জারুলতলা গ্রামের ধান ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেন (৪২)। খাইরুন ম্রং (৩৬) নামে ওই নারীর স্বামী-সন্তানসহ অন্যদের হাতে প্রতিশোধের মাশুল দিয়েছেন ওই নারী ও চোলাই মদে আসক্ত বিল্লাল। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ও এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে এমনটাই ধারণা পাওয়া গেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, উপজেলার পূর্ব গজারিকুড়া গ্রামের নিপিন মানকিন গাজিপুরের এক গরুর খামারে শ্রমিকের কাজ করেন। তার ছেলে জুলিয়ার্স জর্জও স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করেন। একমাত্র ছোট কন্যাকে নিয়ে পূর্ব গজারিকুড়ায় বসবাস করেন নিপিন এর স্ত্রী খাইরুন ম্রং। বাড়িতে সবসময় চোলাই মদের ব্যবসার পাশাপাশি স্বামীর অনুপস্থিতিতে খাইরুন ম্রং মদ পানকারী ও ক্রেতা বিল্লাল হোসেনের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। মাঝেমধ্যেই মদপান শেষে বিল্লাল খাইরুন এর সাথে রাত্রি যাপন করতেন। একপর্যায়ে বিষয়টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের অন্যরা জেনে গেলে উভয়কে সতর্ক করা হয়। তারপরও তারা থেমে যায়নি। সময়ের ব্যবধানে অবৈধ সম্পর্কের প্রমাণ যায় খাইরুন এর স্বামী-সন্তানের কাছে। তখনই তারা ছক কষেন, বিল্লালকে সরিয়ে দিতে।
সম্প্রতি খাইরুন এর স্বামী নিপিন ও তার ছেলে জুলিয়ার্স বাড়ি আসেন। ৪ আগস্ট খাইরুন এর সাথে দেখা করতে ও মদ পান করতে বাড়ি যান বিল্লাল। ধারণা করা হচ্ছে, সেদিন রাতেই মদ পান করিয়ে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বিল্লালকে হত্যা করে নিপিন, তার ছেলে জুলিয়ার্স ও সঙ্গীরা। পরে ওই মরদেহ গুম করতে বাড়ির অদূরে থাকা রঞ্জনা ঝর্ণার (রঞ্জনা খাল) পাশের মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়। পরদিন নিপিন ও জুলিয়ার্স বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে যায়।
এদিকে ৪ আগস্ট রাতে বাড়ি না ফেরায় খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ঝিনাইগাতি থানায় সাধারণ ডায়েরি করে তার পরিবারের লোকজন। সাধারণ ডায়েরির পর পুলিশ সন্দেহজনকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পূর্ব গজারিকুড়া গ্রামের দীপু সাংমাসহ (৬৫) আরও কয়েকজনকে থানায় নিয়ে যায়। তবে ওই সময় সন্দেহজনক কোন তথ্য না পাওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
একপর্যায়ে ১২ আগস্ট দুপুরে স্থানীয়রা রঞ্জনা ঝরনায় মাছ ধরতে গেলে দুর্গন্ধ পেয়ে থানায় খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে মাটি খুঁড়ে বিল্লালের ক্ষতবিক্ষত অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহ উদ্ধারের পরপরই বিক্ষুব্ধ মানুষ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের কয়েকজনের বাড়িতে হামলা দিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। ওইসব বাড়িতে থাকা পুরুষদের আটক করে মারধর শুরু করে। পরে তাৎক্ষণিক পুলিশ আটকদের উদ্ধার করে হেফাজতে নেয় ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানায়, যারা এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত তাদের শাস্তি হোক। কিন্তু ঢালাওভাবে আমাদের বাড়িঘরে হামলা দিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। আমাদের গরু-ছাগল, টাকা-গয়না ও ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমাদের মারধর করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই।
এদিকে বিল্লাল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে পরকীয়া প্রেমিকা খাইরুন ম্রংসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ইতিমধ্যেই খাইরুন ম্রংসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠিয়েছে।
ঝিনাইগাতি থানার ওসি এসএম নূর মোহাম্মদ জানান, প্রাথমিক তদন্তে পরকীয়ার জেরে খাইরুন এর স্বজনেরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্তকাজ শেষ হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। তবে তিনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের কথা অস্বীকার করেন।
সময়ের আলো/আতা