ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করতে নজিরবিহীন কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইতিহাসে বিরল এমন পদক্ষেপ আগামী সপ্তাহে ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। অপরদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইরান যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও নতুন হামলার সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছিল যে, ইরানের নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা হ্রাস পেয়েছে এবং গত কয়েক দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সংঘাত থামাতে তীব্র চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলোতে ভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় নতুন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত বৃহস্পতিবার দেশটির নৌবাহিনীর সদর দফতর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়েছে এ তথ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, আমরা ‘এপিক ফিউরি’ থেকে (ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সাংকেতিক নাম) ‘ইকোনমিক ফিউরি’তে চলে এসেছি। আর প্রেসিডেন্টের নির্দেশে আমরা সেই মাত্রা আরও এক ধাপ বাড়িয়েছি। তাই আগামী সপ্তাহে আরও কিছু ঘোষণার জন্য নজর রাখুন।
কারণ আমরা এমন সব পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি, যা কোনো একটি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করার ইতিহাসে এর আগে কখনো দেখা যায়নি। তবে এসব পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি বেসেন্ট। তবে তিনি জানান, নতুন অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের নৌ অবরোধের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর করা হবে।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনাই করছে না; এর পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও কঠোরভাবে সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহের ঘোষণায় এমন কিছু ব্যবস্থা থাকতে পারে, যার মাত্রা ও ব্যাপকতা অতীতের যেকোনো দেশের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার পদক্ষেপকে ছাড়িয়ে যাবে।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- বেসেন্ট ঠিক কী ধরনের নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক বিধিনিষেধ বা অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন, তা তিনি প্রকাশ করেননি। তাই তার বক্তব্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপের নাম বা পরিধি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
এদিকে ইরানের ওপর চাপ বৃদ্ধির জন্য দেশটির তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোতে আবারও হামলা চালানোর জোর দাবি জানিয়েছেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান। বৃহস্পতিবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রাজনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ সংবাদ প্রকাশ করেছে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৩।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি অগ্রগণ্য পদক্ষেপ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন টাস্কফোর্স গঠন করা। বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রথম বহুজাতিক আক্রমণাত্মক ড্রোন টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সেন্টকম।
প্রতিবেদনের তথ্য মতে, তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে ইরানের বিরুদ্ধে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোতে হামলাসহ সামরিক সংঘাত পুনরায় শুরুর পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। গত সপ্তাহে ইসরাইল সফরকালে তিনি এই প্রস্তাবনা পেশ করেছিলেন।
জানা গেছে, চিফ অব স্টাফ ইয়াল জামির এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কমান্ডারদের পাশাপাশি ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর শীর্ষ অপারেশনাল ফোরামের একটি বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন কুপার।
চ্যানেলটির তথ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে কুপার ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় লড়াই শুরু করার আহ্বান জানান এবং দেশটির গ্যাস, তেল ও বিদ্যুৎ শিল্পের সঙ্গে জড়িত সুবিধাদিসহ জাতীয় অবকাঠামোগুলোতে হামলার তাগিদ দেন।
কুপারকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ইরানের অবকাঠামোতে আঘাত হানলে খেলা (যুদ্ধের) নিয়ম বদলে যাবে। এটি ইরানিদের দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে না।
সেন্টকম প্রধান ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তাদের আরও যে, লড়াই পুনরায় শুরু করাটাই একমাত্র বিকল্প হতে পারে এবং ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের সঙ্গে যৌথ হামলা চালাতে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের।
একই সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, কুপার মার্কিন যৌথবাহিনীর প্রধানদের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের কাছেও তার এই অবস্থান তুলে ধরেছেন এবং প্রস্তাবটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অবহিত করা হয়েছে। ইসরাইলি সম্প্রচারমাধ্যমের এসব দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, গত এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। পরবর্তীতে ১৭ জুন একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা চূড়ান্ত চুক্তির দিকে আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপত্তা এবং নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে মতবিরোধের কারণে পরবর্তীতে আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ে।
গত ৮ থেকে ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দফায় দফায় সামরিক সংঘাত হয়। নতুন এ সংঘাতে ইরানের ভেতরে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ওয়াশিংটন। এর জবাবে জর্ডান, বাহরাইন এবং কুয়েতসহ বেশ কয়েকটি আরব রাষ্ট্রে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জামগুলোতে হামলা চালায় তেহরান।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিমানবাহী রণতরী : মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় নতুন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত বৃহস্পতিবার দেশটির নৌবাহিনীর সদর দফতর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়েছে এ তথ্য।
ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন প্রশান্ত মহাসাগরভিত্তিক বিমানবাহী রণতরী। অর্থাৎ প্রশান্ত মহাসাগর ও ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলে নিরাপত্তা টহলের জন্য ইউএসএস ওয়াশিংটনকে মোতায়েন করেছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনী।
নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে ভিয়েতনামের দা নাং বন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন এবং বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরকে সংযোগকারী মালাক্কা প্রণালিতে রয়েছে। মালাক্কা প্রণালি থেকে ভারত মহাসাগর হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় যাবে এই রণতরী। ইউএসএস ওয়াশিংটনের সফরসঙ্গী হিসেবে সঙ্গে একটি ক্রুজার এবং একটি ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজও রয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন নৌবাহিনীর অধিকাংশ বিমান অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন থেকে। গত ২১ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়াগো বন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়ে ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় পৌঁছায় ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। তার এক মাস পর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে অভিযান শুরু করে মার্কিন বাহিনী।
গত প্রায় ৯ মাস ধরে সমুদ্রে আছেন ইউএসএস লিঙ্কনের নৌসেনারা। দীর্ঘদিন ধরে সাগরে অবস্থান, যুদ্ধের ক্লান্তি, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, ছুটি না পাওয়ায় নৌসেনারা ব্যাপকভাবে মানসিক চাপে আছেন বলে জানা গেছে। এর পাশাপাশি নিয়মিত মেরামতের অভাবে লিঙ্কনে কিছু কারিগরি সমস্যা দেখা দিয়েছে. জাহাজের রসদও ফুরিয়ে আসছে।
এর আগে এক এলাকায় এত দীর্ঘদিন টানা অবস্থানের রেকর্ড কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর নেই। মানসিক চাপের কারণে সম্প্রতি সময়ে কয়েক জন মার্কিন নৌসেনা সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন- এমন তথ্যও পাওয়া গিয়েছে।
এসব ঘটনায় বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। বেশ কয়েক জন ডেমোক্র্যাট আইন প্রণেতা এসব ঘটনার তদন্ত দাবি করেছেন। লিঙ্কনে যেসব নৌসেনা রয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা সেনাদের ফিরিয়ে আনার দাবিতে দিন দিন সোচ্চার হয়ে উঠছেন।
নৌবাহিনীর ওই কর্মকর্তা বলেছেন, সার্বিক দিক বিবেচনা করে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এই বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনকে প্রতিস্থাপন (রিপ্লেসমেন্ট) করবে।