মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা ১০ বিলিয়ন ডলারের মানহানি মামলায় নিজেদের পক্ষে তথ্য ও সাক্ষ্য সংগ্রহ করতে ট্রাম্পের পরিবারের সদস্যদের সমন জারির আবেদন করেছে বিবিসি।
বিবিসির বিরুদ্ধে করা মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের অংশ হিসেবে ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র, মেয়ে ইভানকা ট্রাম্প এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের কাছ থেকে নথি ও সাক্ষ্য নিতে চায় ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যমটি। আদালতে জমা দেওয়া নথি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
মামলাটি মূলত বিবিসির ‘প্যানোরামা’ অনুষ্ঠানের একটি পর্বকে ঘিরে। সেখানে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গার আগে দেওয়া ট্রাম্পের একটি ভাষণের দুটি ভিন্ন অংশ জোড়া দিয়ে প্রচার করা হয়েছিল। বিবিসি পরে ওই সম্পাদনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও দাবি করেছে, ঘটনাটি মানহানির মামলা করার মতো গুরুতর নয়।
বিবিসির আইনজীবীরা আদালতে বলেছেন, ট্রাম্পের বক্তব্য দেওয়ার সময় তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত জ্ঞান রয়েছে। ফলে তাঁদের সাক্ষ্য ও সংশ্লিষ্ট নথি মামলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আদালতে দেওয়া আবেদনে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও ইভানকা ট্রাম্প তাঁদের বাবার ভাষণ সংশোধন ও দেওয়ার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে জ্যারেড কুশনার ট্রাম্পের জন্য একটি খসড়া বিবৃতি তৈরি করেছিলেন, যেখানে সহিংসতার ব্যবহার নিন্দা করার কথা বলা হয়েছিল।
এই তথ্যের ভিত্তিতে পরিবারের তিন সদস্যকে সমন পাঠানোর অনুমতি চেয়েছে বিবিসি। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, হাতে হাতে সমন পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় ই-মেইল ও নিবন্ধিত ডাকের মাধ্যমে তা পাঠানোর অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ইভানকা ট্রাম্প ও জ্যারেড কুশনারের ফ্লোরিডার বাড়িতে সমন পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন বিবিসির আইনি দলের একজন প্রতিনিধি। তবে পুলিশি তল্লাশি চৌকিতে তাঁকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা সমন গ্রহণ করতে পারবেন না।
একইভাবে নিউইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের কাছে সমন পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি। ভবনের একজন কর্মী জানান, সাধারণত এ ধরনের আইনি নথি যিনি গ্রহণ করেন, তিনি তখন মধ্যাহ্নভোজে ছিলেন। দুই দিন পর আবার চেষ্টা করা হলে জানানো হয়, ‘আইন বিভাগ’ সেদিন উপস্থিত নেই।
গত বছরের ডিসেম্বরে ফ্লোরিডার একটি আদালতে বিবিসির বিরুদ্ধে মামলা করেন ট্রাম্প। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ‘প্যানোরামা’ অনুষ্ঠানে তাঁর ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ভাষণ ‘ইচ্ছাকৃত, বিদ্বেষপূর্ণ ও প্রতারণামূলকভাবে’ সম্পাদনা করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের অভিযোগ, সম্পাদনার মাধ্যমে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয় যে তিনি সরাসরি সহিংস কর্মকাণ্ডের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বিবিসি পরে স্বীকার করে, অনুষ্ঠানে ভাষণের দুটি অংশ এমনভাবে জোড়া দেওয়া হয়েছিল, যা ট্রাম্পের বক্তব্য সম্পর্কে ‘ভুল ধারণা’ তৈরি করতে পারে। তবে সম্প্রচারমাধ্যমটি মানহানির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিবিসির যুক্তি, অনুষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রে তাদের নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত হয়নি এবং আইনগতভাবে এটি মানহানির মামলার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে না।
সম্প্রতি ট্রাম্পের আইনজীবীরাও স্বীকার করেছেন, বিবিসির ব্রিটবক্স, বিবিসি ডটকম, বিবিসি সিলেক্ট কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্প্রচারমাধ্যমে ওই অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছিল— এমন দাবির পক্ষে তাঁদের কাছে প্রমাণ নেই।
মামলার শুরুতে বিবিসি এবং তাদের দুটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান— বিবিসি স্টুডিওস প্রোডাকশনস ও বিবিসি স্টুডিওস ডিস্ট্রিবিউশন—কে আসামি করা হয়েছিল।
পরে ট্রাম্প বিবিসির বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিবিসি স্টুডিওসকে মামলা থেকে বাদ দিতে সম্মত হন। বিবিসির পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, ওই প্রতিষ্ঠানটি অনুষ্ঠানটি তৈরি বা প্রযোজনার সঙ্গে জড়িত ছিল না।
এদিকে মামলার আর্থিক দিক নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছে। অনুষ্ঠানটির কারণে তাঁর ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—ট্রাম্পের এমন দাবির বিষয়ে তথ্য যাচাই করতে তাঁর কিছু আর্থিক নথি চেয়েছে বিবিসি।
ট্রাম্পের আইনজীবীরা ওই নথি প্রকাশে আপত্তি জানিয়ে বলেছেন, এতে প্রেসিডেন্টের ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হতে পারে। চলতি মাসের শুরুতে আদালত নথি হস্তান্তরের বিষয়ে ট্রাম্পকে কিছুটা সময় দেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।
মামলাটির বিচার আগামী ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যদি এর আগে মামলাটি খারিজ না হয়।
সময়ের আলো/কেএইচ