বাংলার রক সংগীতের আকাশজুড়ে এক দীপ্ত নক্ষত্রের নাম আইয়ুব বাচ্চু। চট্টগ্রামের মাটি থেকে উঠে এসে যিনি পুরো বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে পাকাপোক্ত আসন গেড়েছিলেন, আজ সেই নক্ষত্রের জন্মদিন। আইয়ুব বাচ্চু মানেই এক নস্টালজিক সুরের ভুবনে হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি।
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামের পটিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল তার তীব্র আকর্ষণ। সত্তর দশকে কৈশোরেই গিটারের প্রেমে পড়েন তিনি। বাবার দেওয়া একটি অ্যাকোস্টিক গিটার হাত ধরেই শুরু হয় তার আজীবন সাধনা। প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার বাইরে নিজের অদম্য কৌতূহল আর ঐকান্তিকতায় তিনি হয়ে ওঠেন জাদুকরী এক গিটারবাদক। জিমি হ্যান্ডরিক্স কিংবা কার্লোস সান্তানার মতো বিশ্বখ্যাত গিটারবাদকদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি গিটারকে নিজের কণ্ঠের মতো কথা বলাতে শিখেছিলেন।
পাশ্চাত্য রক ধাঁচের গানের প্রতি ভালোবাসা থেকেই কলেজ জীবনে ওঠার পরই বন্ধুদের নিয়ে একটি ব্যান্ড গঠন করেন আইয়ুব বাচ্চু। প্রথমে এর নাম ছিল ‘গোল্ডেন বয়েজ’। পরে অবশ্য নাম বদলে ‘আগলি বয়েজ’ রাখেন। এই ব্যান্ডের গায়ক ছিলেন দেশের আরেক সংগীত কিংবদন্তি কুমার বিশ্বজিৎ। আর গিটারিস্ট ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। ছোটখাটো নানা অনুষ্ঠানে গান করত তাদের এই ব্যান্ড। এরপর ১৯৭৮ সালে ফিলিংস ব্যান্ডের মাধ্যমে সংগীতজগতে তার পেশাদার যাত্রার শুরু। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে যোগ দেন দেশের ব্যান্ড ইতিহাসের অন্যতম স্তম্ভ সোলসে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সোলস ব্যান্ডে লিড গিটারিস্ট হিসেবে যুক্ত ছিলেন তিনি।
১৯৯১ সালে সোলস থেকে বের হয়ে তিনি গড়ে তোলেন এলআরবি, বাংলাদেশের ব্যান্ডের ইতিহাসে যা আজ পর্যন্ত এক অবিসংবাদিত নাম। এলআরবি নিয়ে তিনি বাংলা রক সংগীতে এমন এক ধারার জন্ম দেন, যা ছিল সম্পূর্ণ মৌলিক ও আধুনিক। তার হাত ধরেই বাংলাদেশের মানুষ হার্ড রক ও ব্লুজ সংগীতের সত্যিকারের স্বাদ পায়। ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবামেই বাজিমাত করে এলআরবি, যা বাংলা ব্যান্ডের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে আছে।
আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া গানগুলোর বিশেষত্ব ছিল এর কথা ও সুরের গভীরতা। ‘চলো বদলে যাই’, ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’, ‘ফেরারি মন’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘রুপালি গিটার’, ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’-এর মতো গানগুলো কেবল গান নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে একেকটি অনুভূতির নাম। বিশেষ করে ‘এই রুপালি গিটার ফেলে, একদিন আমি দূরে বহু দূরে চলে যাবো’ গানটি আজ যেন তার নিজের জীবনেরই এক ভবিষ্যদ্বাণীর মতো সত্য হয়ে আছে।
অফুরান সৃষ্টিশীলতা ও অকৃত্রিম ব্যক্তিত্ব আইয়ুব বাচ্চু কেবল একজন গায়ক বা গিটারিস্ট ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে সুরকার, গীতিকার এবং সফল সংগীত পরিচালক। চলচ্চিত্রের গানেও তিনি রেখে গেছেন অনন্য স্বাক্ষর। তার সুর করা অসংখ্য গান পেয়েছে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা।
সংগীতের বাইরে তার সরল ও মিশুক স্বভাব তাকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। তরুণ প্রজন্মের প্রতি তার ছিল এক অন্যরকম টান ও ভালোবাসা। নতুন শিল্পীদের সবসময় উৎসাহ দিতেন, শিখিয়ে দিতেন গিটারের নানা কৌশল।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর হঠাৎ করেই না ফেরার দেশে চলে যান এই রক লেজেন্ড। শারীরিকভাবে আইয়ুব বাচ্চু আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার রুপালি গিটার, তার মায়াবি কণ্ঠ এবং সৃষ্টি করা অমর গানগুলো বাংলা পপ ও রক সংস্কৃতিকে যতদিন বাঁচিয়ে রাখবে, ততদিন এই জাদুকর বেঁচে থাকবেন প্রতিটি গানপ্রিয় মানুষের হৃদয়ে।
আজ এই কিংবদন্তির জন্মদিনে সময়ের আলোর পক্ষ থেকে রইল শ্রদ্ধা।
সময়ের আলো/এসএকে