প্রয়াত প্রভাষক সেলিম আহমেদের নিয়োগ অবৈধ দাবি করেও প্রায় দুই দশক বেতন-ভাতা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মোহনপুর গার্লস ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল মালেক মণ্ডলের বিরুদ্ধে। মৃত্যুর পর তার স্ত্রীর কাছে অবসরকালীন পাওনা ও গ্র্যাচুইটির কাগজপত্র ঠিক করে দেওয়ার বিনিময়ে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগও উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কলেজের গভর্নিং বডির সাবেক সভাপতি স্বাক্ষরিত অধ্যক্ষের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ ও কারণ দর্শানোর নোটিশে এসব অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, অধ্যক্ষ নিজেই একটি লিগ্যাল নোটিশের জবাবে প্রয়াত শিক্ষক সেলিম আহমেদের নিয়োগ বৈধ নয় বলে উল্লেখ করেছিলেন। একই জবাবে বলা হয়, তাকে ২০০২ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বেতন দেওয়া হয়েছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে- নিয়োগ অবৈধ হলে প্রায় ২০ বছর ধরে কীভাবে তিনি নিয়মিত বেতন-ভাতা ও সরকারি সুবিধা পেলেন? এছাড়া, নিয়োগে কোনো ত্রুটি থাকলে এত দীর্ঘ সময় তা সংশোধন বা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি কেন?
সেলিম আহমেদের ভাই কেশরহাট পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মাসুদ রানা জানান, ২০০০ সালে তার ভাইকে মোহনপুর গার্লস ডিগ্রি কলেজে সমাজকল্যাণ বিষয়ে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তার দাবি, তৎকালীন রাজশাহী-৩ আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য আবু হেনা কলেজটির সভাপতি ছিলেন। চাকরি নেওয়ার সময় কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুল মালেক মণ্ডলকে ৮০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মাসুদ রানার ভাষ্য, তাদের বাবা মরহুম আবুল হোসেন মিয়া ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক। পরিবারের পক্ষ থেকে অনেক কষ্ট করে ওই টাকা দেওয়ার পর ২০০০ সালের ৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত নিয়োগ বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেলিম আহমেদকে সমাজকল্যাণ বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অধ্যক্ষ আব্দুল মালেক মণ্ডলের স্বাক্ষর করা নিয়োগপত্রে ২০০০ সালের ৯ আগস্ট নিয়োগের বিষয়টি উল্লেখ ছিল। এরপর ১২ আগস্ট তিনি প্রভাষক পদে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি এমপিওভুক্ত হন।
প্রায় ২১ বছর চাকরির পর ২০২১ সালের ২৭ আগস্ট স্ট্রোক করেন সেলিম আহমেদ। পরে ২৯ আগস্ট রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
প্রয়াত শিক্ষকের স্ত্রী তামান্না ইয়াসমিনের অভিযোগ, স্বামীর মৃত্যুর পর তার গ্র্যাচুইটি ও অবসরকালীন পাওনা তুলতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক করে দেওয়ার জন্য তিনি অধ্যক্ষের কাছে যান। কিন্তু অধ্যক্ষ বিভিন্নভাবে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষে গেলে আব্দুল মালেক মণ্ডল তার কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক করে দেওয়ার কথা বলা হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর অধ্যক্ষ তাকে কলেজের বাইরে একান্তে দেখা করতে বলেন। টাকা দিতে বা অধ্যক্ষকে খুশি করতে না পারায়, পরবর্তীতে তার স্বামীর নিয়োগ বৈধ নয় জানিয়ে কাগজপত্রে স্বাক্ষর করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তামান্না ইয়াসমিন জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি অ্যাডভোকেট এম. আমিনুল ইসলামের মাধ্যমে অধ্যক্ষের কাছে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে দেওয়া ওই নোটিশের জবাবে সেলিম আহমেদের নিয়োগ বৈধ নয় বলে উল্লেখ করা হয়।
এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন- নিয়োগ অবৈধ হলে প্রায় ২ দশক ধরে তাকে বেতন-ভাতা দেওয়া হলো কেন? আর যদি নিয়োগ বৈধ হয়ে থাকে, তাহলে মৃত্যুর পর পরিবারের পাওনা নিষ্পত্তির সময় কেন নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো?
অধ্যক্ষের সাময়িক বরখাস্তের আদেশে বলা হয়েছে, সেলিম আহমেদকে দীর্ঘ সময় বেতন দেওয়া হয়েছে। নথিতে দাবি করা হয়, প্রায় ২০ বছরে তাকে বেতন বাবদ প্রায় ৮০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। গভর্নিং বডির পক্ষ থেকে বিষয়টিকে সরকারি অর্থের তছরুপের শামিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই বেতন যদি সরকারি বা সরকারি সহায়তার অর্থ থেকে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে নিয়োগের বৈধতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আপত্তি বা প্রশ্ন আগে ওঠেনি কেন? এমপিওভুক্তির সময় নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।
কারণ দর্শানোর নোটিশেও সেলিম আহমেদের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, তার মৃত্যুর প্রায় ২ বছর পেরিয়ে গেলেও অবসরসংক্রান্ত কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়নি।
পরে কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব না দেওয়ার অভিযোগে ২০২৪ সালের ২১ মার্চ কলেজের গভর্নিং বডি অধ্যক্ষ মো. আব্দুল মালেক মণ্ডলকে সাময়িক বরখাস্ত করে। বরখাস্তের আদেশে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নৈতিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, গভর্নিং বডির সভাপতির নির্দেশনা উপেক্ষা, ঘুষ ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে।
প্রয়াত সেলিম আহমেদের পরিবার সূত্রে জানা যায়, মৃত্যুর সময় তার সর্বশেষ বেতন-স্কেল ছিল প্রায় ৪৪ হাজার টাকা। তিনি স্ত্রী তামান্না ইয়াসমিন ও ২ মেয়ে রেখে গেছেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, সোনালী ব্যাংকে সেলিম আহমেদের প্রায় ৮ লাখ টাকার লোন ছিল। সুদসহ সেই দায় বর্তমানে কয়েক গুণ বেড়েছে বলে পরিবারের দাবি। এর ফলে প্রয়াত শিক্ষকের প্রাপ্য গ্র্যাচুইটি, অবসরকালীন সুবিধা ও অন্যান্য পাওনা দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ায় পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সেলিম আহমেদের নিয়োগসংক্রান্ত মূল নথি, নিয়োগ বোর্ডের সিদ্ধান্ত, নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র, এমপিওভুক্তির কাগজপত্র, ইনডেক্স সংক্রান্ত নথি এবং দীর্ঘ সময়ে তার বেতন-ভাতা প্রদানের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে ২০০০ সালে নিয়োগের সময় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, ২০০১ সালে এমপিওভুক্তির সময় কাগজপত্র কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল এবং ২০২৪ সালে এসে কেন একই নিয়োগকে অবৈধ বলা হলো- এসব প্রশ্নের উত্তরও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
অন্যদিকে প্রয়াত শিক্ষকের স্ত্রী যে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ করেছেন, তারও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগটি সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সত্য না হলে সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
অভিযোগের বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুল মালেক মণ্ডলের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও, তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তার মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে মোহনপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কলেজের বিদ্যোৎসাহী সদস্য মাহবুব আর রশিদ বলেন, ‘বিষয়টি আমাকে কেউ বলেনি। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। ভুক্তভোগী শিক্ষকের স্ত্রী যদি অভিযোগ করে থাকেন, তাহলে তা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।’
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কলেজ পরিদর্শক নাজিম উদ্দীন আহমেদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ওবাইদুর নামে একজন জানান, স্যার মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন। সরাসরি এসে বক্তব্য নিলে ভালো হয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহীর চেয়ারম্যান (প্রেষণে) প্রফেসর ড. শামীম আরা চৌধুরী বলেন, ‘মোহনপুর গার্লস ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর মো. হুমায়ূন কবীর বলেন, ‘আমি এখানে নতুন এসেছি বিষয়টি আমার জানা নেই। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সময়ের আলো/মহু