‘বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’— চরণদ্বয় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা বিখ্যাত ‘নারী’ কবিতা থেকে নেওয়া। কবি এখানে নারী ছাড়া পুরুষ এবং পুরুষবিহীন নারী যে মূল্যহীন সেটিই বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসেই যে ধরণি সুন্দরতর রূপ পায়— পংতিদ্বয়ে তা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। যুগ-কাল কিংবা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুরুষের এগিয়ে চলায় নারীই যে সবচেয়ে বড় প্রেরণাদায়ী, পুরুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। এ নিয়ে বাংলাদেশের প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীর বেশ জনপ্রিয় একটি গানও রয়েছে। ১৯৯৬ সালে ‘এই ঘর এই সংসার’ ছবিতে গানটি ব্যবহৃত হয়। গানের দুটি লাইন ছিল এমন— ‘নারীর কারণে সবই হয় নারীর কারণে, পুরুষ বড় হয় জগতে নারীর কারণে।’
নারী শুধু অনুপ্রেরণা কিংবা উৎসাহ, ভালোবাসার প্রতীকই নন; ত্যাগ-তিতিক্ষায়ও তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একজন পুরুষ হোক সে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা খেলোয়াড়— তার সাফল্যে সবচেয়ে বড় অবদান কিন্তু নারীর। বিশেষ করে তার সহধর্মিণীর। সন্তান লালন-পালন থেকে গৃহস্থালি সামলানো— সবই শক্ত হাতে পরিচালনা করেন তারা। সমাজের প্রতিটি স্তরে পুরুষের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো না কোনো নারীর ভূমিকা রয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনও তার ব্যতিক্রম হয়। সময়ের আলোর পাঠকের সামনে আজ এমন কিছু নারীর ভূমিকা তুলে ধরা হবে, যারা তাদের স্বামীদের অগ্রযাত্রায় অগ্রপথিক, অগ্রগামী সেনানী। তারা বেগম রোকেয়ার সেই ভাগনি, যারা না জাগলে তাদের স্বামীদের এগিয়ে যাওয়া, বছরের পর বছর দেশের জার্সিতে খেলা কিংবা দেশের জন্য সাফল্য বয়ে আনা ছিল অসম্ভব।
ফরহাদ আহমেদ শিতুল। বাংলাদেশ জাতীয় হকি দলের ডিফেন্ডার। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর খেলোয়াড়। সেই ২০১৩ সাল থেকে লাল-সবুজ জার্সিতে খেলছেন, জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সামনে জাপানে এশিয়ান গেমস রয়েছে, এখন সেই আসরে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। একটা সময় মা, বোন আর বাবার স্নেহ, ভালোবাসা, অনুশাসনে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করলেও, এখন তার জীবনের সম্পূর্ণজুড়ে সহধর্মিণী জান্নাতুন ফেরদৌস সোমা। প্রায় পাঁচ বছর হতে চলল শিতুল-সোমার যুগলবন্দি জীবন। তবে পাঁচ বছরে এক ছাদের নিচে বাস করা হয়েছে খুবই কম।
বই পড়া, পরিবারের অন্য সদস্যের সময় দেওয়া, রান্না আর শিতুলের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা— এভাবেই কাটে সোমার জীবন। বিশেষ দিনগুলো যেমন জন্মদিন বিয়েবার্ষিকী অথবা ঈদে যখন শিতুলকে পান না, তখন ভীষণ খারাপ লাগে সোমার। তবে মন খারাপ হলেও পরক্ষণে ভুলেও যান যখন দেখেন তার স্বামী দেশের জার্সিতে খেলছেন, দেশের পতাকার জন্য লড়ছেন। সময়ের আলোকে রাজশাহী থেকে সোমা বলছিলেন, ‘যখন দেখি সে দেশকে রিপ্রেজেন্ট করে তখন ভালো লাগে। শিতুলের পরিবার, ওর বাবা-মা, বোন, দুলাভাই অনেক পজিটিভ। আমাকে তারা অনেক সাপোর্ট করেন। শিতুল অনেক ভালো মনের মানুষ। আমাকে ভীষণ ভালোবাসে আর সাপোর্ট করে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি ওর মতো জীবনসঙ্গী পেয়ে। আলহামদুলিল্লাহ।’ বিয়ের পর রাজশাহীতেই বেশিরভাগ সময় ছিলেন শিতুলের স্ত্রী। তবে গত সাত মাস হলো ঢাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে এক ছাদে থাকছেন। আর এই ৭ মাসকেই নিজের জীবনের এখন পর্যন্ত সেরা সময় বলে উল্লেখ করেছেন সোমা।
শিতুলের সঙ্গে তারই সতীর্থ রেজাউল করিম বাবু এবং মাহবুব হোসেনের দারুণ মিল। রেজাউল বাবু জাতীয় হকি দলের পরীক্ষিত ডিফেন্ডার। স্ত্রী আতিয়া ইবনাহা আঞ্জুমান। তিন বছরের সংসার বাবু-আঞ্জুমান দম্পতির। তাদের ঘরে এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান। তাকে ঘিরেই আঞ্জুমানের জীবন। স্বামী রেজাউল বাবুকে সেভাবে কাছে পান না। হোক সেটা জন্মদিন, বিয়েবার্ষিকী কিংবা ঈদ। তবে স্বামীকে অল্প সময়ের জন্য পেলেও কোনো রাগ-ক্ষোভ নেই। বরং গর্ব করে আঞ্জুমান বলেন, ‘আমার স্বামী দেশের জন্য লড়াই করে, দেশের জন্য সাফল্য আনতে ঘাম ঝরায়— এমনটা কজনার স্বামী করে।’ তবে রাগ না হলেও আঞ্জুমান তার স্বামীকে ভীষণ মিস করে। বিশেষ করে সন্তান যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, সেই সময়টা রেজাউলকে ভীষণ মিস করে বলে জানান আঞ্জুমান।
জাতীয় হকি দল এবং নৌবাহিনীর খেলোয়াড় মাহবুব হোসেনের গল্পটা সবে শুরু। বছর দুই হতে চলল নওগাঁর মেয়ে সুমাইয়া জান্নাতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন। গত দুই বছরে এক সঙ্গে দুজনের জন্মদিন এবং বিয়েবার্ষিকী— ভালোভাবে কোনোটাই সম্পন্ন করতে পারেননি এই জুটি। নওগাঁ থেকে সময়ের আলোকে মাহবুবের স্ত্রী সুমাইয়া জান্নাত বলছিলেন, ‘সত্যি বলতে মাহবুবকে ভীষণ মিস করি। এখন তো আমি চার মাসের সন্তান-সম্ভবা। এখন আরও বেশি মিস করি। এতদিন ও কাছে না থাকলে পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ততায় দিন কাটত। তারপরও আমি খুশি মাহবুবের মতো জীবনসঙ্গী আল্লাহ পাক আমাকে দান করেছেন। ও সত্যিই খুব ভালো মানুষ, ভালো মনের মানুষ।’
বাংলাদেশের তারকা বক্সার মো. সেলিম হোসেন। পাঁচ বছরের বেশি সময় হলো মোছাম্মত রুমা খাতুনের সঙ্গে সংসার পেতেছেন। সেলিম শুধু জাতীয় দলের বক্সারই নন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীরও সদস্য। সেলিম-রুমা দম্পত্তির এক মেয়ে রয়েছে। তাকে ঘিরেই এখন রুমার জীবন। স্বামীকে সবসময় কাছে পান না। রাজশাহী থেকে সময়ের আলোকে রুমা বলছিলেন, ‘সেলিমকে কাছে না পাওয়ার কষ্ট হয়। বিশেষ করে কোনো বিশেষ দিন, জন্মদিন কিংবা আমাদের বিয়েবার্ষিকীতে তাকে পাশে না পাওয়াটা সত্যিই কষ্টের। কখনো কখনো একা বাচ্চা আর সংসার সামলাতেও কঠিন লাগে। তবু সব কষ্টের ঊর্ধ্বে আমার কাছে তার স্বপ্নটা বড়। দেশের জন্য কিছু করা, বাংলাদেশের পতাকা বুকে নিয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। সে যখন দেশের হয়ে মাঠে নামে, তখন আমার সব কষ্টের চেয়ে গর্বটাই বেশি অনুভব হয়।’
বাংলাদেশ ফুটবল জাতীয় দলের তারকা ফরোয়ার্ড সুমন রেজা। একই সঙ্গে তিনি বিমানবাহিনীতেও চাকরি করেন। সুমনের স্ত্রী খাদিজা খাতুন। সুমন একজন পেশাদার ফুটবলার। বছরজুড়ে ক্লাব ক্যাম্পেই তার সময় কাটে। এ ছাড়া জাতীয় দলের হয়েও দেশ-বিদেশে সফর তো রয়েছেই। আবার বিমানবাহিনীর চাকরি। এত কিছু সামলে পরিবারকে সেভাবে সময় দেওয়া হয় না। তবে সুমনের এই অভাব কিছুতেই বুঝতে দেননি খাদিজা। এই দম্পত্তির পাঁচ বছর বয়সি এক ছেলেসন্তান রয়েছে। তাকে ঘিরেই খাদিজার জীবন। এর বাইরে সুমনের পরিবার অর্থাৎ খাদিজার শ্বশুর-শাশুড়ি তো রয়েছেনই।
টাঙ্গাইল থেকে সময়ের আলোকে খাদিজা বলেন, ‘আমার স্বামী একজন ব্যস্ত ফুটবলার। ক্লাব এবং জাতীয় দল, এর পাশাপাশি ওনার চাকরিও রয়েছে। আমি জানি উনি কতটা পরিশ্রম করেন। দেশের জন্য এবং আমাদের জন্য। সুমনের মতো সঙ্গী পেয়ে আমি সত্যিই ভীষণ খুশি। সুমন আল্লাহ পাকের দেওয়া আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। তাকে বিয়ে করে আমি শুধু স্বামীই পাইনি, সন্তান পেয়েছি এবং শ্বশুররূপে বাবা এবং শাশুড়িরূপে মা পেয়েছি। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’
মুনিম শাহরিয়ার জুম্মন। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল এবং ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিচিত মুখ। ময়মনসিংহের ছেলে মুনিমের স্ত্রী ইফফাত কথা। এই দম্পত্তির এক মেয়েসন্তান রয়েছে। যাকে ঘিরেই ইফফাতের পুরো জগৎ। ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচিতে পরিবারকে সেভাবে সময় দেওয়া হয় না মুনিমের। স্বামীকে সবসময় সেভাবে কাছে পান না ইফফাত। তাই বলে স্বামীর প্রতি কোনো অভিমান-অনুযোগ নেই। বরং মুনিমের মতো জীবনসঙ্গী পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবানই মনে করছেন ইফফাত। সময়ের আলোকে ইফফাত বলেন, ‘তার লক্ষ্যের পেছনে, তার স্বপ্নের পেছনে অকপট ছুটে যাওয়ার পথটা সহজ করে দিতে গিয়ে জীবনসঙ্গী হিসেবে হয়তো বেশ কিছু ত্যাগ স্বীকার করেছি, নিয়মিত করছি। তবে দিনশেষে যখন দেখি, সে তার স্বপ্ন পূরণের জন্য, লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম ও নিরন্তর চেষ্টা করছে এবং তাতে আত্মতৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছে, তখন আমিও তার সেই আত্মতৃপ্তিতেই শান্তি খুঁজে পাই।’
ইফফাত কথা আরও বলেন, ‘মুনিমের অর্জন, তার ধৈর্য, হার না মেনে নিরন্তর চেষ্টা করে যাওয়ার উদ্যম সবকিছু নিয়েই আমি তার ওপর ভীষণ গর্বিত। দেশের জন্য অনেক ভালো কিছু করতে পারার যে স্বপ্ন সে লালন করে, সেই স্বপ্ন যেন অবশ্যই পূর্ণ হয়— এটাই আমার একান্ত চাওয়া।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা