আজ ২৪ আগস্ট, ঐতিহাসিক ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবসের ৩১তম বার্ষিকী। দীর্ঘ তিন দশক আগে ১৯৯৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরে কয়েকজন বিপথগামী পুলিশ সদস্যের হাতে ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল কিশোরী ইয়াসমিন। এই পৈশাচিক ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল দিনাজপুরের সর্বস্তরের জনতা। প্রতিবাদী সাধারণ মানুষের ওপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে সামু, সিরাজ, কাদেরসহ ৭ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই ১৯৯৬ সাল থেকে নারী সংগঠনগুলো দেশব্যাপী দিনটিকে ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। দিবসটি উপলক্ষে আজ বিকেল সাড়ে ৪টায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন ও আলোচনাসভার আয়োজন করেছে।
১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্টের ঘটনা। দীর্ঘদিন পর মাকে দেখার আকুল টানে ঢাকা থেকে দিনাজপুরে ফিরছিল কিশোরী ইয়াসমিন। ২৩ আগস্ট বিকেলে ঢাকার গাবতলী থেকে দিনাজপুরগামী কোচে আসন না পেয়ে সে ঠাকুরগাঁওগামী ‘হাসনা এন্টারপ্রাইজ’-এর একটি নৈশকোচে ওঠে। কোচের সুপারভাইজার তাকে দিনাজপুরের দশমাইল নামক স্থানে নামিয়ে স্থানীয় এক চায়ের দোকানদার হারেছের জিম্মায় দেন এবং সকাল হলে দিনাজপুর শহরগামী কোনো বাসে তুলে দেওয়ার অনুরোধ করেন।
রাত তখন সাড়ে তিনটার দিকে একটি টহল পুলিশের পিকআপ এসে থামে সেই চায়ের দোকানের সামনে। পুলিশ সদস্যরা মেয়েটির পরিচয় ও গন্তব্য জানতে চাইলে দোকানদার জানান যে, ইয়াসমিনের বাড়ি দিনাজপুর শহরে এবং সে ঢাকা থেকে একা এসেছে। তখন পুলিশ সদস্যরা তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে শহরে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে পিকআপে তুলে নিতে বলেন। ঘাতকদের পরিচয় বুঝতে না পেরে এবং রক্ষক ভেবেই শেষ রাতের ঘন অন্ধকারে দশমাইলের সেই চায়ের দোকানদার ইয়াসমিনকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। ইয়াসমিনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক তাকে পিকআপে তোলে পুলিশ।
পথিমধ্যে পুলিশ কিশোরী ইয়াসমিনকে উপর্যুপরি ধর্ষণ ও হত্যা করে। পাশবিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দশমাইল থেকে দিনাজপুর শহরমুখী প্রায় ২০০ গজ দূরে আদিবাসী সাধনা স্কুলের সামনে প্রধান সড়কে পিকআপ থেকে লাফিয়ে পড়ে ইয়াসমিন। এ সময় পুলিশের পিকআপটি কিছুসময় সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। ফজরের আজানের সময় দশমাইল মোড় থেকে মুসল্লিরা পিকআপের পেছনের বাতি জ্বলতে দেখে এগিয়ে আসতে চাইলে পুলিশ দ্রুতগতিতে শহর অভিমুখে চলে যায়। ঘটনাস্থলের পাকা সড়কে মুসল্লিরা রক্ত ও ভাঙা চুড়ি দেখতে পেয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। পরে পুলিশ শহরের ব্র্যাক অফিসের পাশ থেকে ইয়াসমিনের লাশ উদ্ধার করে দিনাজপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
পরের দিন ২৫ আগস্ট বিকেলে দশমাইল মোড়ে তৎকালীন জাগপা নেতা আব্দুল মজিদের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তৎকালীন স্থানীয় নেতা এবং পরবর্তীসময়ে সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল পুলিশ সদস্যদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের দাবি জানান।
২৬ আগস্ট রাত আটটার দিকে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ জনতা দোষী পুলিশ সদস্যদের বিচারের দাবিতে কোতোয়ালি থানা ঘেরাও করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার গ্যাস ও ফাঁকা গুলি চালালে জনতা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে থানার সীমানা প্রাচীর ভেঙে ফেলেন। পুলিশ প্রশাসন ঘটনা ধামাচাপা দিতে নিষ্পাপ কিশোরী ইয়াসমিনকে ‘পতিতা’ হিসেবে চালানোর অপচেষ্টা করলে আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
পরদিন ২৭ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে শহরের রামনগর মাঠ থেকে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ জনতা শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি দিতে যাওয়ার পথে মুন্সিপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির সামনে পৌঁছালে পুলিশ ও দাঙ্গা পুলিশ নির্বিচারে গুলি ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। পুলিশের গুলিতে সামু, কাদের ও সিরাজসহ ৭ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরবর্তীতে বিক্ষুব্ধ জনতা চারটি পুলিশ ফাঁড়ি ও চারটি পিকআপ ভ্যান জ্বালিয়ে দেয়। আন্দোলন ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে সাদা পোশাকধারী কিছু অপরিচিত ব্যক্তি প্রেস ক্লাবসহ স্থানীয় পাঁচটি পত্রিকা অফিসে আগুন দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শহরে কারফিউ জারি করা হয় এবং বিডিআর মোতায়েন করা হয়।
১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রংপুর বিশেষ আদালতে ইয়াসমিন হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। আদালত দোষী সাব্যস্ত করে তিন পুলিশ সদস্য— এএসআই মইনুল হোসেন, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার এবং পিকআপ চালক অমৃত লাল বর্মনকে ফাঁসির রায় দেন। তবে আলামত গোপনের অভিযোগে তৎকালীন পুলিশ সুপার আব্দুল মোতালেব এবং জনতার মিছিলে গুলিবর্ষণের নির্দেশদাতা তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (জেলা প্রশাসক) জব্বার ফারুকীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদেরকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন।
দিনাজপুর ট্র্যাজেডির ৩১তম বার্ষিকী স্মরণে আজ বিকেল সাড়ে ৪টায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দিনাজপুর জেলা শাখা মুন্সিপাড়াস্থ নিজস্ব কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে। এছাড়া দিনাজপুর লেখক ফোরাম সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা ও কবিতা পাঠের আয়োজন করেছে।
সময়ের আলো/জোই