পাথারিয়ার পাদদেশে সুগন্ধির সাম্রাজ্য, বিশ্ববাজারে বড়লেখার ‘উদ’

বড়লেখা (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা

সারাদেশ

বাংলাদেশের সুগন্ধি শিল্পে আগর-আতরের সমার্থক নাম মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর। শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এই শিল্প আজ দেশের

2026-08-25T21:14:38+00:00
2026-08-25T21:14:38+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
১০ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
পাথারিয়ার পাদদেশে সুগন্ধির সাম্রাজ্য, বিশ্ববাজারে বড়লেখার ‘উদ’
বড়লেখা (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ৯:১৪ পিএম 
পাথারিয়ার পাদদেশে সুগন্ধির সাম্রাজ্য, বিশ্ববাজারে বড়লেখার ‘উদ’। ছবি : সময়ের আলো
বাংলাদেশের সুগন্ধি শিল্পে আগর-আতরের সমার্থক নাম মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর। শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এই শিল্প আজ দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের প্রাকৃতিক রফতানি খাত। পাথারিয়া পাহাড়ঘেরা এই জনপদে উৎপাদিত আগর কাঠ, আগর তেল (উদ) ও আতর বহুদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে সমাদৃত। কিন্তু বৈশ্বিক চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই তুলনায় শিল্পটির প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক বিপণন এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

ইতিহাস বলছে, প্রাচীনকাল থেকেই আরব বণিকরা উপমহাদেশে আগর কাঠের বাণিজ্য করতেন। তাঁদের হাত ধরেই এ অঞ্চলে আগর ও আতরের পরিচিতি বিস্তার লাভ করে বলে ধারণা করা হয়। তবে বড়লেখায় পরিকল্পিত আগর চাষের সূচনা হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। আশির দশকে এসে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে আগর চাষ ও আতর উৎপাদন বাণিজ্যিক রূপ পায়। এরপর ধীরে ধীরে এটি বড়লেখার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়।

আগরগাছের প্রকৃত মূল্য তার কাঠে নয় বরং সংক্রমণের ফলে গাছের ভেতরে তৈরি হওয়া রজনসমৃদ্ধ কালচে অংশে। স্থানীয় ভাষায় এই অংশকে বলা হয় ‘মাল’। এই রজন থেকেই আহরণ করা হয় আগর তেল বা ‘উদ’, যা বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান প্রাকৃতিক সুগন্ধি উপাদান। শুধু আগর তেল নয়, আগর কাঠের চিপস, গুঁড়া এবং ধূপজাত পণ্যেরও আন্তর্জাতিক বাজারে রয়েছে উল্লেখযোগ্য চাহিদা। ফলে একটি আগরগাছের প্রায় প্রতিটি অংশই অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান।

বড়লেখার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে কোনো না কোনোভাবে আগর শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন হাজারো মানুষ। কেউ আগর বাগান গড়ে তুলেছেন, কেউ কাঠ প্রক্রিয়াজাত করছেন, কেউ আতর উৎপাদন করছেন, আবার কেউ রফতানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। একটি আগরগাছ বাণিজ্যিকভাবে পরিপক্ব হতে ২৫ থেকে ৩০ বছর সময় লাগে। দীর্ঘ পরিচর্যা ও ধৈর্যের পর সেই গাছ থেকেই তৈরি হয় উচ্চমূল্যের পণ্য, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলেছে।

এই শিল্পের সবচেয়ে বড় সম্পদ কাঁচামাল নয়, বরং প্রজন্মান্তরে গড়ে ওঠা কারিগরি দক্ষতা। কাঠ বাছাই, রজনসমৃদ্ধ অংশ আলাদা করা, শুকানো, কুচি করা, পানিতে ভিজিয়ে রাখা এবং শেষ পর্যন্ত পাতন প্রক্রিয়ায় আগর তেল আহরণ প্রায় প্রতিটি ধাপই নির্ভর করে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ওপর। বড়লেখার দক্ষিণভাগ ইউনিয়নের দোহালিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামের শত শত কারিগর আজও এই ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন। তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি আগর কাঠ ও আগর তেল পৌঁছে যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সুগন্ধি শিল্পে।

শিল্পটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর আন্তর্জাতিক বাজার। প্রাকৃতিক সুগন্ধির প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগর তেল ও আতরের চাহিদাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সুগন্ধি শিল্প, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের বিলাসবহুল পারফিউম বাজারে প্রাকৃতিক আগর তেলের কদর দিন দিন বাড়ছে। এই বাস্তবতায় আগর-আতর বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত উচ্চমূল্যের রফতানি পণ্যে পরিণত হওয়ার সব ধরনের সম্ভাবনা ধারণ করে।

তবে সম্ভাবনার বিপরীতে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন, গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ, ব্র্যান্ডিং এবং বাজার সম্প্রসারণে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগের অভাব এখনো স্পষ্ট। উদ্যোক্তাদের মতে, নীতিগত কিছু জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে শিল্পটির বিকাশ কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না।

বর্তমানে সুজানগর, দক্ষিণভাগ, শাহবাজপুর ও কাঠালতলী এলাকাজুড়ে কয়েক হাজার উদ্যোক্তা এবং অসংখ্য আতর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা সক্রিয় রয়েছে। এই শিল্প শুধু বড়লেখার অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করেনি একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ‘মৌলভীবাজারের আগর’ ও ‘মৌলভীবাজারের আগর আতর’ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। এই স্বীকৃতি শুধু ঐতিহ্যের স্বীকৃতি নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব সুগন্ধি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে এর পূর্ণ সুফল পেতে হলে আন্তর্জাতিক নিবন্ধন, আধুনিক প্যাকেজিং, কার্যকর ব্র্যান্ডিং এবং রফতানি বাজার সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিন দশকের বেশি সময় ধরে আগর চাষের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন জামাল উদ্দিন। তিনি বললেন, একটি আগরগাছকে বাণিজ্যিকভাবে উপযোগী করতে দীর্ঘ সময় পরিচর্যা করতে হয়। আগে সংক্রমণ ঘটাতে গাছে পেরেক ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে বাজারে প্রাকৃতিকভাবে সংক্রমিত কাঠের চাহিদা বাড়ায় সেই পদ্ধতি প্রায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গাছ পরিপক্ব হলে পাইকাররা বাগানে এসে মূল্য নির্ধারণ করে কিনে নেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহেদ আহমদ ও এমদাদ হোসেন রুহেল জানিয়েছেন, বাগান মালিকদের কাছ থেকে আগরগাছ কিনে প্রথমে তা বিভিন্ন আকারে কেটে চিপস বা ডাস্ট তৈরি করা হয়। এরপর সেগুলো প্রক্রিয়াজাতকারীদের কাছে বিক্রি করা হয়, যারা এগুলো থেকে আগর তেল ও আতর উৎপাদন করেন। তাঁর ভাষায়, এই ধাপটি পুরো উৎপাদন ব্যবস্থার ভিত্তি।

দক্ষিণভাগ ইউনিয়নের দোহালিয়া গ্রামের শ্রমিকেরা দিনের পর দিন নিভৃতে কাজ করে আগর কাঠের রজনসমৃদ্ধ অংশ আলাদা করেন। স্থানীয় ভাষায় ‘পাছরানী’ নামে পরিচিত এই সূক্ষ্ম কাজের পর কাঠ শুকিয়ে প্রস্তুত করা হয় বাজারজাতের জন্য। তাঁদের কথায়, “আমাদের পরিশ্রমের সুবাসই একসময় বিশ্বের নানাপ্রান্তে পৌঁছে যায়।”

গোল্ডেন বাংলা পারফিউমের স্বত্বাধিকারী আবুল কাসেম বলেছেন, আগর শিল্পের জন্য একটি বিশেষায়িত শিল্পপার্ক, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি ভেজাল প্রতিরোধ ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কবির আহমেদ চৌধুরীর ভাষায়, দেশের মোট আগর ও আতর উৎপাদনের প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই বড়লেখাকে কেন্দ্র করে। এই শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি রফতানি খাত নয় বরং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।

বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক সুগন্ধির বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। সেই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার এখনই উপযুক্ত সময়। দীর্ঘমেয়াদি নীতিসহায়তা, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণ এবং কার্যকর ব্র্যান্ডিংয়ের সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বড়লেখার আগর-আতর শিল্প পোশাকশিল্পের পর দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের রফতানি খাতে পরিণত হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, দক্ষ কারিগর, অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা-এই চারটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বড়লেখার আগর-আতর শিল্প। তবে এই সম্ভাবনাকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে প্রয়োজন সরকারি নীতিসহায়তা, আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং রফতানি অবকাঠামোর উন্নয়ন।

শতবর্ষের ঐতিহ্য, জিআই স্বীকৃতি এবং বিশ্ববাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে পুঁজি করে বড়লেখার আগর-আতর শিল্প এখন নতুন সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প দেশের উচ্চমূল্যের অপ্রচলিত রফতানি খাত হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।

সময়ের আলো/আতা


  বিষয়:   পাথারিয়া  পাদদেশ  সুগন্ধির সাম্রাজ্য  বিশ্ববাজার  বড়লেখা  উদ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: