নাটোরের গুরুদাসপুরে নন্দকুঁজা নদীতে ডুবে মারা যাওয়া দুই শিশুর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে স্থানীয়দের তীব্র ক্ষোভ ও হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশের দুই সদস্য। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাতে উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের ওয়াপদা বাজারসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে জানাজার প্রাক্কালে এই ঘটনা ঘটে। পরে প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্বে অবহেলা, ত্রুটি ও অসংগতির প্রমাণ পাওয়ায় ওই দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে নাটোর পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া দুই পুলিশ সদস্য হলেন, গুরুদাসপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল বাসার (৪৫) ও কনস্টেবল রাকিব হোসেন (৩৬)। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নাটোরের পুলিশ সুপার শরিফুল ইসলাম।
পুলিশ সুপার জানান, মৃত দুই শিশুর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির জন্য গুরুদাসপুর থানার এসআই আবুল বাশার ও কনস্টেবল রাকিব ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তবে তাদের তৈরি প্রতিবেদনে অসংগতি ও গুরুতর ত্রুটি পাওয়া গেছে। এ কারণে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার বিকেলে গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে নন্দকুঁজা নদীতে ডুবে ফারহান ইসলাম (৮) ও লাম ইসলাম নামের দুই শিশু মারা যায়। ফারহান চন্দ্রপুর গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে এবং লাম একই গ্রামের বাবুল ইসলামের ছেলে। তারা দুজনেই স্থানীয় চন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে খাওয়ার পর শিশু দুটি নদীর তীরের একটি আমবাগানে খেলছিল। খেলতে খেলতে একপর্যায়ে তারা নন্দকুঁজা নদীর কিনারায় গোসল করতে নামে। দুজনের কেউই সাঁতার না জানার কারণে নদীর স্রোতে তলিয়ে যায়। নদীর পাড়ে থাকা এক ব্যক্তি তাদের তলিয়ে যেতে দেখে চিৎকার শুরু করলে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে নাটোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ওই দুই শিশুর মরদেহ ওয়াপদা বাজারসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে জানাজার আয়োজনে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী সামসুল হকসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জানাজার ঠিক আগমুহূর্তে দুই পুলিশ সদস্য সেখানে উপস্থিত হয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির অজুহাতে মরদেহ দুটি জোরপূর্বক থানায় নিতে চান। এ সময় মরদেহের কাফনের কাপড় সরিয়ে শরীর অনাবৃত করা হয়েছে—এমন অভিযোগে উপস্থিত জনতা চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শোকের সময়ে পুলিশের এমন সংবেদনশীলতাহীন তৎপরতা পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা দুই পুলিশ সদস্যের ওপর চড়াও হন। তাদের কিল-ঘুষি মারার পাশাপাশি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ওই দুই পুলিশ সদস্য দ্রুত ওয়াপদা বাজারের একটি দোকানে গিয়ে আশ্রয় নেন।
স্থানীয় নেতা সামসুল হক জানান, সুরতহালের নামে পুলিশের এমন অনুচিত আচরণে গ্রামের প্রায় দেড় হাজার মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। উত্তেজিত লোকজন পুলিশ সদস্যরা যে দোকানে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেটি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেন। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ওই দুই পুলিশ সদস্য গ্রামবাসীর কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চান, তবুও তারা ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে রক্ষা পাননি।
খবর পেয়ে গুরুদাসপুর থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে অবরুদ্ধ দুই পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করা হয়।
এ বিষয়ে গুরুদাসপুর থানার তদন্ত কর্মকর্তা এস এম রিয়াজুল হাসান জানান, হামলার খবর পাওয়ার পরই তাৎক্ষণিকভাবে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এলাকায় গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা বা কাউকে আটক করা হয়নি।
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নানের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার মোবাইলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সময়ের আলো/জোই