'আইসিইউতে' রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

সাইফুল ইসলাম, রংপুর ব্যুরো

সারাদেশ

উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতাল। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন এখানে। কিন্তু প্রয়োজনীয়

2026-08-28T18:26:29+00:00
2026-08-28T19:24:14+00:00
 
  শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬,
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
'আইসিইউতে' রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
বিকল শতাধিক যন্ত্রপাতি, বন্ধ সিটি স্ক্যান-এনজিওগ্রাম
সাইফুল ইসলাম, রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৬:২৬ পিএম  আপডেট: ২৮.০৮.২০২৬ ৭:২৪ পিএম
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ছবি : সংগৃহীত
উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতাল। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন এখানে। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকট, পুরোনো যন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা এবং জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের দুটি সিটি স্ক্যান মেশিন অচল, বন্ধ রয়েছে এনজিওগ্রাম সেবাও। ফলে জরুরি রোগীদের অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হচ্ছে হাসপাতালের বাইরে বেসরকারি রোগনির্ণয় কেন্দ্রে। এতে রোগীর ভোগান্তির পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে।

সম্প্রতি রংপুর নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের মুন্সিপাড়ার বাসিন্দা আমানত আলীকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকেরা সিটি স্ক্যান করার পরামর্শ দেন। কিন্তু হাসপাতালের দুটি সিটি স্ক্যান মেশিনই অচল থাকায় তাঁকে বাইরে নিয়ে সিটি স্ক্যান করাতে হয়।

আমানত আলীর ছেলে জহুর উদ্দিন বলেন, আব্বাকে হাসপাতালের বাইরে নিয়ে পরীক্ষা করাতে গিয়ে আমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। আর্থিক ক্ষতিও হয়েছে। হাসপাতালেই যন্ত্রটি সচল থাকলে আমাদের এত দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।

হাসপাতালের রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, হাসপাতালে দুটি সিটি স্ক্যান মেশিন রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দুটিই অচল। ফলে প্রতিদিনই রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

শুধু সিটি স্ক্যান নয়, হাসপাতালের আরও বিপুলসংখ্যক চিকিৎসা যন্ত্র অচল পড়ে আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ছোট-বড় ও মাঝারি মিলিয়ে প্রায় ৬০০টি যন্ত্র অচল অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে এমআরআই, সিটি স্ক্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন ছোট চিকিৎসা সরঞ্জামও রয়েছে।


হৃদ্‌রোগ বিভাগেই বেশি অচল যন্ত্র
হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিভাগে যন্ত্রপাতির সংকট সবচেয়ে প্রকট বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এ বিভাগে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক যন্ত্র অচল রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কার্ডিয়াক মনিটর দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

এনজিওগ্রাম সেবার অবস্থাও নাজুক। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ভাষ্য, করোনা মহামারির আগেই এনজিওগ্রাম মেশিন অচল হয়ে যায়। অল্প সময় চালু থাকার পর আবার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে এ সেবা বন্ধ রয়েছে। ফলে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে ঢাকায় গিয়ে এনজিওগ্রাম করানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

হৃদ্‌রোগ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল চিকিৎসক বলেন, কোনো রোগীর জরুরি এনজিওগ্রামের প্রয়োজন হলে তাঁকে উন্নত চিকিৎসা ও পরীক্ষার জন্য ঢাকায় যাওয়ার পরামর্শ দিতে হয়। রংপুর শহরেও বেসরকারি পর্যায়ে এই সেবা সীমিত থাকায় রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ে।

আইসিইউতেও পড়ে আছে অব্যবহৃত যন্ত্র
হাসপাতালের আইসিইউ ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে না। এর মধ্যে ইকো মেশিন ও পোর্টেবল এক্স-রে মেশিনও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা জানান।

আইসিইউ থেকে বের হওয়ার পর একটি কক্ষে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায় ‘সি-আর্ম’ লেখা একটি কক্ষ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিশেষ ধরনের এই যন্ত্রটি কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় টেবিল সরবরাহ না করায় এটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা বা সরবরাহ করা যন্ত্র পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।


প্রয়োজনীয় যন্ত্র চেয়ে অধিদপ্তরে চিঠি
হাসপাতালের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রয়োজনীয় ও অচল যন্ত্রপাতির তালিকা তৈরি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে চলতি অর্থবছরের জন্য প্রায় দুই শত ধরনের যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে চাওয়া হয়েছে— ইকো মেশিন, ওপিজি মেশিন, ডেন্টাল চেয়ার, ফ্যাকো মেশিন, জেনারেল অ্যানেস্থেশিয়া মেশিন, কার্ডিয়াক পেশেন্ট মনিটর, অডিওস্কপি মেশিন, ইটিটি মেশিন, ল্যাবরেটরি রেফ্রিজারেটর ও পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন।

কর্মকর্তারা বলেন, এসব যন্ত্রের বেশ কয়েকটি পুরোনো হয়ে বারবার নষ্ট হচ্ছে। আবার কোনো কোনো যন্ত্র হাসপাতালে একেবারেই নেই। ফলে নতুন যন্ত্র সরবরাহ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, বিষয়টি হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করা হয়েছে। লিখিতভাবেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আবেদন পাঠানো হয়েছে।

রোগীর খরচ বাড়ছে, বাড়ছে ভোগান্তি
৬৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের আট জেলার মানুষের প্রধান ভরসার জায়গা। রংপুর ছাড়াও পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন।

হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা এক হাজার হলেও রোগীর চাপ থাকে এর চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে স্ট্রোক, হৃদ্‌রোগ ও সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের জরুরি চিকিৎসায় দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়। কিন্তু হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র অচল থাকায় তাঁদের অনেককেই বাইরে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

ঠাকুরগাঁওয়ের বাসিন্দা ও রংপুরে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী তুহিন ইসলাম জানান, তাঁর বাবা দীর্ঘদিন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অস্ত্রোপচারের তারিখ একাধিকবার পরিবর্তন হওয়ায় তাঁকে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। বাবার চিকিৎসার পাশাপাশি বাইরে থেকে বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে হয়েছে। এতে পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ পড়ে এবং তাঁর পড়াশোনাও ব্যাহত হয়।


সমাধান কোথায়?
রমেক হাসপাতালে যন্ত্রপাতির সংকট নতুন নয়। কোনো যন্ত্র ছোটোখাটো ত্রুটির কারণে দীর্ঘদিন পড়ে থাকে, আবার কোনো যন্ত্র পুরোপুরি অচল হয়ে গেলেও সময়মতো প্রতিস্থাপন করা হয় না— এমন অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

চিকিৎসকদের একাংশের মতে, শুধু নতুন যন্ত্র কেনা নয়, যন্ত্রের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল, কারিগরি সহায়তা এবং সময়মতো মেরামত নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কোন যন্ত্র কতটা প্রয়োজন, কোনটি সচল আছে এবং কোনটি অচল— এসবের নিয়মিত অডিট ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা দরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে যন্ত্রপাতি কেনার পর সেগুলো অচল পড়ে থাকলে বিনিয়োগের সুফল রোগীরা পান না। তাই নতুন যন্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি পুরোনো যন্ত্র দ্রুত মেরামত, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিস্থাপন, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান নিয়োগ এবং কেন্দ্রীয়ভাবে যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

রমেকের মতো উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ একটি হাসপাতালে জরুরি রোগনির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা যাতে হাসপাতালের ভেতরেই নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। 

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী অধ্যাপক আসাদুল হাবিব দুলু সময়ের আলোকে জানিয়েছেন, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ও জনবল সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সময়ের আলো/আতা


  বিষয়:   আইসিইউ  রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল  রমেক  সময়ের আলো  যন্ত্রপাতি  সিটি স্ক্যান  এনজিওগ্রাম 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: