জীবিকার তাগিদে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে বছরের পর বছর নিখোঁজ হচ্ছেন বরগুনার পাথরঘাটার জেলেরা। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, উত্তাল ঢেউ ও বৈরী আবহাওয়ার কবলে ট্রলারডুবির পাশাপাশি গভীর সমুদ্রে যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও বাড়াচ্ছে এ ঝুঁকি। নিখোঁজ জেলেদের অনেকেরই বছরের পর বছর সন্ধান না মেলায় অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে স্বজনদের।
পাথরঘাটা উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১৮৮ জন জেলে নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে। ওই সময় সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে সাগরে নিখোঁজ হন ৯১ জন জেলে। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে ৫ জন, ১৯৯৪ সালে ২ জন, ২০০১ সালে ৫ জন, ২০০৬ সালে ১৪ জন, ২০০৭ সালে ৯১ জন, ২০১৪ সালে ৭ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন এবং ২০২৩ সালে ১৫ জন জেলে নিখোঁজ হন।
নিখোঁজ এসব জেলের তালিকা প্রকাশ করে দুই বছর আগে পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদের সামনে স্মৃতিফলক উন্মোচন করে উপজেলা প্রশাসন। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৪ আগস্ট বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ‘এফবি বরকত’ ট্রলারডুবির ঘটনায় পাঁচ জেলে নিখোঁজ হন। পরে একজনের মরদেহ উদ্ধার হলেও বাকি চারজনের সন্ধান মেলেনি। ফলে উপজেলা প্রশাসনের তালিকাভুক্ত ১৮৮ জনের সঙ্গে ‘এফবি বরকত’ ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ চারজনকে যোগ করলে মোট নিখোঁজ জেলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯২ জনে।
নিখোঁজ জেলে ইউসুফ আলীর ছোট ভাই ইয়াকুব আলী বলেন, ভাই দুই সন্তান রেখে সাগরে গিয়েছিল। আর ফেরেনি। বাচ্চাগুলো সারাদিন বাবা বাবা করে কান্না করে। জীবিত আছে না মারা গেছে— এই অনিশ্চয়তায় দিন কাটে আমাদের।
পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের রুহিতা গ্রামের নিখোঁজ জেলে কালু মাঝির মেয়ে ফাহিমা রিমু বলেন, বাবা গেছে তিন বছর। প্রতিদিন মনে হয় দরজায় দাঁড়িয়ে ডাক দেবে— ‘মা, আইছি’। আমরা না খেয়ে দিন কাটাই। মা অসুস্থ, ওষুধ কেনারও টাকা নেই। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কোন সুযোগ সুবিধাও পাইনা। আমাদের মতো যেন আর কোনো সন্তান বাবা হারিয়ে না কাঁদে।
জেলে ও সংশ্লিষ্টদের মতে, গভীর সমুদ্রে অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও রেডিও যোগাযোগ কার্যকর না থাকায় আবহাওয়ার সতর্কবার্তা সময়মতো জেলেদের কাছে পৌঁছায় না। দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।
জানা যায়, বৈরী আবহাওয়ায় দিক হারিয়ে ভারতীয় জলসীমায় ঢুকে পড়ায় অনেক জেলে আটক হন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় মিধিলির সময় নিখোঁজ বরগুনার ১৭ জেলের সন্ধান প্রায় দুই বছর পর ভারতের গুজরাটের একটি কারাগারে পাওয়া যায়।
এর আগে একই বছরের ১৫ আগস্ট সাগরে মাছ ধরার সময় ‘এফবি ফাতেমা’ ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে সেটি ভাসতে ভাসতে দেশের জলসীমা অতিক্রম করে ভারতীয় জলসীমায় চলে যায়। পরে ভারতের চব্বিশ পরগনার ছোট মোল্লাখালী কোস্টাল এলাকায় দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ট্রলারে থাকা ১১ জেলেকে আটক করে। তাঁরা পরবর্তীতে ভারতীয় আইনে সাজা ভোগ করে দেশে ফেরেন।
এ ছাড়া এর আগেও পাথরঘাটার ছয় জেলে ভারতীয় জলসীমায় ঢুকে আটক হয়ে দীর্ঘ কারাভোগ শেষে দেশে ফিরেছেন। ফলে দীর্ঘদিন নিখোঁজ জেলেদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর পাশাপাশি অন্য দেশের জলসীমায় আটক থাকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তবে সাগরে নিখোঁজ জেলেদের পরিবারগুলোর আরেকটি বড় সমস্যা হলো মৃত্যু সনদ না পাওয়া। মরদেহ উদ্ধার না হওয়ায় অনেক পরিবার সরকারি সহায়তা, উত্তরাধিকার, ব্যাংক হিসাব, জমিজমা ও অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতার মুখে পড়ে। ফলে স্বজন হারানোর অনিশ্চয়তার পাশাপাশি কাগজপত্রের জটিলতাও মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাঁদের।
বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সহ-সভাপতি আবুল হোসেন ফরাজী অভিযোগ করে বলেন, সাগরে দুর্ঘটনায় পড়া জেলেদের উদ্ধারে অতীতেও তাঁরা প্রশাসনের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাননি। দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রমের অভাবে অনেক সময় নিখোঁজ জেলেদের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, জেলেদের নিরাপত্তায় সরকারের কাছে একটি ‘সেফটি সেল’ গঠনের দাবি জানানো হলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। সাগরে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত এই সেল গঠনসহ কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, প্রতিবছরই বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে পাথরঘাটার অনেক জেলে নিখোঁজ হচ্ছেন। বৈরী আবহাওয়া, হঠাৎ সাগর উত্তাল হয়ে ওঠা, ট্রলারডুবি ও গভীর সমুদ্রে পর্যাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেক সময় দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না, ফলে নিখোঁজ জেলেদের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গভীর সমুদ্রে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম এবং দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া ইনচার্জ মোহাম্মদ রায়হান বলেন, বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সাগরের কারণে গভীর সমুদ্রে উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় নানা জটিলতা রয়েছে। এছাড়া গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্ধারকারী সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ফলে নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে গভীর সমুদ্রে অভিযান চালানো সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, উপকূলের কাছাকাছি নদ-নদী ও এলাকায় কোস্টগার্ডের নিয়মিত টহল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া ও পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়।
বরগুনা জেলা প্রশাসক তাসলিমা আক্তার বলেন, সাগরে জেলে নিখোঁজের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ায় জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের পাশে প্রশাসন থাকবে।
তিনি বলেন, নিখোঁজ জেলেদের পরিবার যাতে মৃত্যু সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে না পড়ে, সে বিষয়েও আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। একই সঙ্গে জেলেদের নিরাপত্তায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
সময়ের আলো/আতা