দিনমজুরের টাকা ফেরত না দিয়ে বাঁশখালী ছাড়লেন সেই এসআই

মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম)

সারাদেশ

তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার কথা বলে বাঁশখালীর ক্ষুদ্র খামারি নুরুল আলমের কাছ থেকে ঘুষ আদায়ের অভিযোগের সংবাদ প্রকাশের পর রামদাস হাট

2026-08-29T00:15:13+00:00
2026-08-29T00:34:41+00:00
 
  শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬,
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
দিনমজুরের টাকা ফেরত না দিয়ে বাঁশখালী ছাড়লেন সেই এসআই
সময়ের আলোর সংবাদ নজরে আসার পর ক্লোজড, চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনে সংযুক্ত
মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৫ এএম  আপডেট: ২৯.০৮.২০২৬ ১২:৩৪ এএম
রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই সুমন কবির মৃধা। ছবি : সংগৃহীত
তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার কথা বলে বাঁশখালীর ক্ষুদ্র খামারি নুরুল আলমের কাছ থেকে ঘুষ আদায়ের অভিযোগের সংবাদ প্রকাশের পর রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই সুমন কবির মৃধাকে ক্লোজড করা হয়েছে। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের আদেশে তাকে ক্লোজড করা হয়।

এর আগে, শুক্রবার সকাল ৯টা ৪৭ মিনিটে দৈনিক সময়ের আলোর অনলাইন ভার্সনে ‘এগুলো কওন লাগে, রিপোর্ট দিতে কিছু খরচ আছে না’— শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, মামলার তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার কথা বলে আদায় করা দিনমজুর নুরুল আলমের টাকা ফেরত না দিয়েই বাঁশখালী ছেড়েছেন এসআই সুমন কবির মৃধা। টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে এখন ক্লোজড করা হয়েছে ভাই। আমি এখন গাড়িতে, চট্টগ্রাম চলে যাচ্ছি। গাড়ি থেকে নেমে টাকার বিষয়টি সমাধান করে ফেলবো।’

সুমন কবির মৃধাকে চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আপনার নিউজটি আমরা আমলে নিয়েছি। রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই সুমন কবির মৃধাকে এসপি স্যার চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করেছেন এবং এই অভিযোগের তদন্ত হবে। এখনও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। যেহেতু উনি ক্লোজড হয়েছেন, তদন্ত তো অবশ্যই হবে। হয়তো এটা দু-এক দিন পর এসপি স্যার একটা ইনকোয়ারি করবেন।’


প্রতিবেদককে বশে আনতে মামলার বাদীকে ফোন
সংবাদ প্রকাশের পর মামলার বাদী নুরুল আলমকে ফোন করে প্রতিবেদক বেলাল উদ্দিনকে বুঝানোর জন্য অনুরোধ করেন এসআই সুমন কবির মৃধা। এ সংক্রান্ত ১০ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের একটি কল রেকর্ড হাতে এসেছে এ প্রতিবেদকের হাতে।

এতে সুমনকে বলতে শোনা যায়, ‘বেলাল ভাইকে একটু ফোন করে বোঝান। বলবেন, একটু ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে। এটা সমাধান হয়েছে, বলুন। আমাকে সবাই ফোন করে গালিগালাজ করতেছে, ভাই। আপনি যা করেছেন ভালো করেছেন।’

এসময় নুরুল আলম বলেন, ‘টাকা পয়সা দেয় তখনই, যখন কেউ অন্যায় করে। আমি তো অন্যায় করিনি। এরপরও আপনাকে টাকা দিয়েছি সঠিক রিপোর্ট দেওয়ার জন্য।’

তখন সুমন বলেন, ‘আমি তো আপনেরে চাপাচাপি করি নাই। আপনি আমার ক্ষতি করলে করছেন আর কি। আমি আপনার ক্ষতি করতাম না।’

জবাবে নুরুল আলম বলেন, ‘আমি যদি অন্যায় করে থাকি, ক্ষতি করবেন আর কী। আমি তো অন্যায় করিনি। আমি কোর্টে মামলা করেছি ন্যায় বিচারের জন্য। এখন ন্যায় বিচারের জন্য যদি আবার টাকা খরচ করতে হয়, তাহলে মামলা করে লাভ কী?’

প্রত্যুত্তরে সুমন বলেন, ‘টেনশন কইরেন না। আপনের রিপোর্ট দিয়ে দিমু। এরে মানা কইরা দেন। বলবেন সমাধান হয়ে গেছে। আমি টাকাটোকা চাই নাই।’


‘বেলাল ভাই, আপনি কি মাইন্ড করেছেন? স্যরি ভাই’
এদিকে খামারি নুরুল আলমের কাছ থেকে ঘুষ আদায়ের বিষয়টি এ প্রতিবেদককে ফোন করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এসআই সুমন কবির মৃধা। তিনি ফোনে বলেন, ‘বেলাল ভাই, আপনি কি মাইন্ড করেছেন? স্যরি ভাই। যা হওয়ার হয়ে গেছে। অন্য দৃষ্টিতে নিয়েন না। ঐ টাকাটা আমি তারে দিয়ে দিমু। সমস্যা নেই। আইজকের ভিতরে দিয়ে দিমু।’

এর আগে যা ঘটেছিল
খামারে গরু-মুরগি পালন করে সংসারের চাকা ঘোরান নুরুল আলম (৪৫)। বাঁশখালীর চন্দ্রপুর গ্রামের বরপুরা এলাকায় তাঁর মালিকানাধীন জামশেদ এক্সপ্রেস ডেইরি অ্যান্ড অ্যাগ্রো ফার্ম। ঘাম-শ্রমে গড়ে তোলা সেই খামারেই গত ৭ জুলাই দিবাগত রাতে ঘটে চুরির ঘটনা। আর সেই ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উঠেছে ঘুষ দাবির অভিযোগ।

গত ২৩ জুন খামার দেখাশোনার জন্য ছনুয়া ইউনিয়নের মধুখালী এলাকার মাহমুদুল করিম ওরফে মাদু (৩২) নামের এক ব্যক্তিকে কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেন নুরুল আলম। নিয়োগের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় খামারে চুরি হলে সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে ওই কর্মচারীর দিকে।

এ ঘটনায় খামারের মালিক নুরুল আলম বাদী হয়ে গত ২৬ জুলাই বাঁশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তদন্তের নির্দেশ দেন।

মামলার আরজিতে বলা হয়, রাতের আঁধারে প্রকল্পে কেউ না থাকার সুযোগে প্রজেক্ট অফিসের ড্রয়ার থেকে নগদ ২৭ হাজার টাকা, প্রায় ৩ হাজার টাকা মূল্যের পাঁচটি দেশি মুরগি এবং ৯০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ষাঁড় নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার পর থেকে পলাতক মাহমুদুল করিম।

মামলাটির তদন্তভার পান রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুমন কবির মৃধা। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর মামলাটির প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে। তবে তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন অভিযোগ সামনে এসেছে। মামলার প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়ে খামারি নুরুল আলমের কাছে টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে তদন্ত কর্মকর্তা সুমন কবির মৃধার বিরুদ্ধে।


প্রথমে নাশতার বিল, পরে গাড়িভাড়া
নুরুল আলমের ভাষ্য, মামলা করার প্রায় এক সপ্তাহ পর তাঁকে ফোন করে রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে যেতে বলেন এসআই সুমন কবির মৃধা। তিনি গুণাগরী গিয়ে ফোন করলে তাঁকে ‘পিউরিয়া’ নামের একটি দোকানে যেতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে মামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানান তিনি। নুরুল আলমের দাবি, সেদিন নাশতার বিল বাবদ তাঁকেই ১ হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়। ফেরার সময় গাড়িভাড়ার কথা বলে আরও ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয় তাঁর কাছ থেকে।

তবে অভিযোগের এখানেই শেষ নয়।

সরেজমিনে গিয়ে আবারও টাকার দাবি
গত ২৬ আগস্ট মামলার তদন্ত করতে জামশেদ এক্সপ্রেস ডেইরি অ্যান্ড অ্যাগ্রো ফার্মে যান এসআই সুমন কবির মৃধা। সরেজমিনে তদন্ত শেষে মামলার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুনরায় ৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন খামারি নুরুল আলম।

তিনি বলেন, ‘প্রথম ধাপে তাকে আমি ১৫ শত টাকা দিয়েছি। আমি একজন ক্ষুদ্র খামারি। গতকাল তদন্ত করতে এসে আমার কাছ থেকে ওসি স্যারকে দেওয়ার কথা বলে আবার ৫ হাজার টাকা দাবি করতেছে। আমি তখন তাকে ৩ হাজার টাকা দিয়েছি। দাবিকৃত বাকি টাকা না দিলে আমার পক্ষে রিপোর্ট দেবে না বলে সাফ জবাব দিয়েছে।’

একজন ক্ষুদ্র খামারির কাছে তদন্ত প্রতিবেদন যেন আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া না হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকার অঙ্কে— এমনটাই অভিযোগ নুরুল আলমের।

‘রিপোর্ট দিতে কিছু খরচ-টরস আছে না?’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে- এ প্রতিবেদক ফোন করেন এসআই সুমন কবির মৃধাকে। টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টাকার বিষয়ে এটা কওয়া লাগে নাকি? মামলার রিপোর্ট দেওয়ার জন্য কিছু খরচ আছে না? এটা কেউ দেয়। আবার কেউ দেয় না। এটা যার যার ব্যাপার। এটা ভুয়া কথা। আমি জোর করে চাইনি।’

তদন্ত প্রতিবেদনের বিনিময়ে টাকা দাবির অভিযোগের বিষয়ে তাঁর এমন বক্তব্য নিয়েই উঠছে নানা প্রশ্ন।

ওসিকে দেওয়ার কথা বলে টাকা দাবির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন কবির মৃধা বলেন, ‘রিপোর্ট দিতে দেরি আছে। রিপোর্ট দেওয়ার সময় আছে আরও ৩ মাস। যে সময় রিপোর্ট দিমু, তখন এটার বিষয়ে কথা কমুনি।’


ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যা বললেন
অভিযোগের বিষয়ে বাঁশখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুধাংশু শেখর হালদারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘এটার বিষয়ে আমি তাকে বলে দিচ্ছি। আপনি বাদীর নাম বলুন।’

তবে এসআই সুমন কবির মৃধার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক বলেন, ‘এটা একটা বদমায়েশ। এ পর্যন্ত ওসি টাকা নিয়েছে এমন কিছু শুনেছেন? আমি তো কখনো এসবকে প্রশ্রয় দিই না। আপনি মামলা নম্বরটা পাঠিয়েন। দ্রুত রিপোর্ট দিয়ে দেবে। আমি তাকে বলে দেব। পারফরম্যান্স খারাপ থাকলে, তারা চাকরিও করতে পারবে না।’

ওসির নাম ব্যবহার করে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ওসির নাম তো সবাই বেচে। বোঝেন নাই? ওসির নাম না বেচলে হয়? ওসির নাম সবাই বেচে, আপনি আমাকে মামলা নম্বরটা দিয়েন। আমি বলে দেব।’

অভিযোগ নতুন নয়, দাবি স্থানীয়দের
স্থানীয়দের অভিযোগ, রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে কর্মরত এসআই সুমন কবির মৃধার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। মামলার তদন্ত প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে সেবাপ্রার্থীদের নানা কৌশলে জিম্মি করে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

একদিকে মামলার বাদীর ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা, অন্যদিকে তদন্ত প্রতিবেদনকে ঘিরে অর্থ দাবির অভিযোগ, সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আইনের কাছে যেখানে সত্যের মূল্য সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা, সেখানে সেই সত্য কি টাকার অঙ্কে মাপা হচ্ছে?

সময়ের আলো/আতা


  বিষয়:   দিনমজুর  বাঁশখালী  এসআই  চট্টগ্রাম  পুলিশ লাইন 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: