পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়েছে বিরল সামুদ্রিক মাছ ‘স্লেন্ডার সানফিশ’। অদ্ভুত আকৃতির প্রায় ২ কেজি ৭০০ গ্রাম ওজনের মাছটি মহিপুর মৎস্য বন্দরে আনা হলে স্থানীয় জেলে, ব্যবসায়ী ও উৎসুক মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়। মাছটি দেখতে বন্দরে ভিড় করেন অনেকে।
রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে সাগরে অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ ধরার সময় জেলেদের জালে মাছটি উঠে আসে। পরে মাছটি মহিপুর মৎস্য বন্দরের শাহীন এন্টারপ্রাইজের আড়তে নেওয়া হয়। তবে অচেনা ও অস্বাভাবিক আকৃতির হওয়ায় মাছটি কিনতে কোনো ব্যবসায়ী আগ্রহ দেখাননি।
মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Ranzania laevis। স্থানীয় জেলেদের কাছে এ ধরনের মাছ প্রায় অপরিচিত। জেলেরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সাগরে মাছ শিকার করলেও এমন আকৃতির মাছ তারা আগে দেখেননি। মাছটি বিষাক্ত কি না— এমন আশঙ্কাও তৈরি হয় তাদের মধ্যে।
জেলে সাইফুল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাগরে মাছ শিকার করছি। বিভিন্ন ধরনের মাছ জালে উঠেছে। কিন্তু এ ধরনের মাছ আগে কখনো দেখিনি। এর আকৃতি ও গঠন অন্য মাছের তুলনায় একেবারেই আলাদা।
আরেক জেলে আবদুর রব বলেন, অন্যান্য মাছের সঙ্গে জালেই মাছটি ধরা পড়ে। বন্দরে আনার পর মাছটি দেখতে অনেক মানুষ জড়ো হন। তবে বিষাক্ত হতে পারে এমন কথা শুনে কেউ কিনতে চাননি।
ব্লু অ্যাকশন ফান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত ডব্লিউসিএস (WCS) ও ওয়ার্ল্ডফিশের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত ‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান মাছটির প্রাথমিক পরিচয় সম্পর্কে বলেন, বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখে এটিকে Slender Sunfish (Ranzania laevis) বলে মনে হচ্ছে।
তিনি জানান, এটি প্রচলিত বাণিজ্যিক সামুদ্রিক মাছের মতো নয়; বরং খোলা সমুদ্রের একটি মহাসাগরীয় প্রজাতি। অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে মাছ ধরার জালে বাইক্যাচ হিসেবেও এ ধরনের মাছ উঠে আসে। বঙ্গোপসাগরেও এ প্রজাতির উপস্থিতির তথ্য রয়েছে।
বখতিয়ার রহমান আরও বলেন, তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায় এমন সামুদ্রিক প্রাণীর উপস্থিতি বঙ্গোপসাগরের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এ ধরনের মাছ ধরা পড়লে শুধু বাজারজাত না করে মাছটি কোথায়, কত গভীরে এবং কী ধরনের জালে ধরা পড়েছে—এসব তথ্যের পাশাপাশি এর দৈর্ঘ্য ও ওজন সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এসব তথ্য বঙ্গোপসাগরের জীববৈচিত্র্য, প্রজাতির বিস্তৃতি এবং সামুদ্রিক পরিবেশের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, বঙ্গোপসাগর জীববৈচিত্র্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিভিন্ন সময়ে জেলেদের জালে বিরল ও অল্প পরিচিত সামুদ্রিক প্রজাতির মাছ ধরা পড়ছে। স্লেন্ডার সানফিশের মতো মাছ ধরা পড়ার ঘটনাও গবেষণা ও সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হতে পারে।
তিনি বলেন, এ ধরনের বিরল প্রজাতির মাছ ধরা পড়লে জেলেদের দ্রুত মৎস্য বিভাগকে জানানো উচিত। এতে মাছটির সঠিক পরিচয় শনাক্ত করার পাশাপাশি প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
স্থানীয়রা জানান, কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে বিভিন্ন সময়ে বিরল সামুদ্রিক প্রাণী ও মাছ ধরা পড়লেও স্লেন্ডার সানফিশের মতো মাছ খুব কমই দেখা যায়। তাই মাছটি বন্দরে আনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সেটি দেখতে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।
বিরল এ মাছের উপস্থিতি আবারও জানান দিল, কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের গভীরে এখনো অনেক অজানা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য লুকিয়ে রয়েছে।
সময়ের আলো/জোই