ঝালকাঠি ১০০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে অনুমোদিত ৬৬টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৩ জন। ফলে ৫৩টি পদই শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ২১টি বিষয়ে কোনো চিকিৎসক নেই। পাশাপাশি সহকারী সার্জনের অনুমোদিত ২০টি পদেও কর্মরত নেই একজনও।
চিকিৎসকের তীব্র সংকটের কারণে হাসপাতালটিতে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত চিকিৎসকেরা। প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা না পেয়ে অনেক রোগীকেই বরিশালসহ আশপাশের এলাকার হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বহির্বিভাগের চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে অনেক রোগীকে আধা ঘণ্টা থেকে প্রায় এক ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এ নিয়ে রোগী ও স্বজনদের অনেককেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বহির্বিভাগে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ এবং জরুরি বিভাগে ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ৬৬টি চিকিৎসক পদের মধ্যে সিনিয়র কনসালট্যান্টের ১০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। তিনি নাক-কান-গলা (ইএনটি) বিভাগের চিকিৎসক। অর্থোপেডিক সার্জারি, সার্জারি, কার্ডিওলজি, চক্ষু, রেডিওলজি, অ্যানেসথেসিয়া, গাইনি, মেডিসিন ও শিশু বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্টের পদগুলো শূন্য।
জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১২টি পদের মধ্যে অর্থোপেডিক সার্জারি, সার্জারি ও অ্যানেসথেসিয়া বিভাগে একজন করে চিকিৎসক রয়েছেন। বাকি ৯টি পদ শূন্য। এসব শূন্য পদের মধ্যে রয়েছে কার্ডিওলজি, চক্ষু, রেডিওলজি, মেডিসিন, শিশু, ইএনটি, গাইনি, চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগ।
এ ছাড়া সহকারী সার্জনের ২০টি অনুমোদিত পদের একটিতেও কোনো চিকিৎসক নেই। সহকারী সার্জন বা সমমানের আটটি পদের মধ্যে একজন কর্মরত এবং সাতটি পদ শূন্য। জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কর্মকর্তার আটটি পদের মধ্যে দুজন কর্মরত, শূন্য ছয়টি। চারটি মেডিকেল অফিসার পদের বিপরীতে কর্মরত তিনজন এবং একটি পদ শূন্য।
আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার একটি পদ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞের একটি এবং তত্ত্বাবধায়কের একটি পদে চিকিৎসক কর্মরত আছেন। তবে ডেন্টাল সার্জন ও ইউনানি চিকিৎসা কর্মকর্তার একটি করে পদ থাকলেও দুটিই শূন্য।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. টি এম মেহেদী হাসান বলেন, ‘চিকিৎসক সংকটের কারণে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ রোগী দেখতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি বিভাগেও দায়িত্ব পালন করতে হয়।’
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাসুম ইফতেখার বলেন, ‘সীমিত জনবল দিয়ে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। চিকিৎসক সংকটের কারণে রোগীর চাপ বেশি হলে প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি আমাকেও মাঝেমধ্যে রোগী দেখতে হয়। রোগীরা যাতে প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’
হাসপাতালে কার্ডিওলজি, চক্ষু, শিশু, গাইনি, রেডিওলজি, অ্যানেসথেসিয়া, সার্জারি ও অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ শূন্য। ফলে এসব বিষয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অনেক সময় অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দা ইমাম হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না পেলে বরিশাল যেতে হয়। এতে চিকিৎসার খরচের পাশাপাশি যাতায়াত ও সময় দুটিই বাড়ে।’
ঝালকাঠি পৌরসভার জেলেপাড়া রোডের বাসিন্দা কামাল সরদার বলেন, ‘হৃদ্রোগ বা চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ দরকার হয়। সদর হাসপাতালে সেই চিকিৎসক না থাকলে রোগীকে অন্যত্র নিয়ে যেতে হয়।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঝালকাঠি জেলা সম্পাদক ইসমাইল মুসাফির বলেন, ‘১০০ শয্যার হাসপাতালে দিনের পর দিন এত বিপুলসংখ্যক চিকিৎসকের পদ শূন্য থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসক সংকট এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে চারজন চিকিৎসককে সহকারী সার্জন হিসেবে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে পদায়ন করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে একজন যোগ দিয়েছেন। বাকি তিনজন যোগদান করেননি। ফলে নতুন করে পদায়ন হলেও চিকিৎসক সংকটে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি।
ঝালকাঠি সদর হাসপাতালটি ১৯৮৩ সালে ৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে। ২০০৩ সালে এটি ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। ২০১৮ সাল থেকে হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার কাজ চলছে।
বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, ‘বিভাগের সব উপজেলায় চিকিৎসক সংকট রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। বিশেষ করে ঝালকাঠি জেলার দিকে আমাদের আলাদাভাবে নজর রয়েছে।’
সময়ের আলো/এসএকে