গ্যাস সংকটের কারণে ময়মনসিংহের শম্ভূগঞ্জে অবস্থিত ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন টানা এক মাস ধরে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হঠাৎ অচল হয়ে পড়ায় এবং একই সময়ে অঞ্চলের অন্য দুটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে আসায় গোটা ময়মনসিংহ বিভাগজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে।
১৯৯৭ সালে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) কর্তৃক প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল। মূলত এই অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ এবং শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে আরপিসিএল এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছিল, যেখানে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)। তবে ২০০৭ সালের পর থেকে দেশে গ্যাস সংকট বাড়তে থাকলে কেন্দ্রটিতে সরবরাহ কমতে শুরু করে।
আরপিসিএলের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে কেন্দ্রটির প্লান্ট ফ্যাক্টর ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ থাকলেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ৪৫ শতাংশে নেমে আসে এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অনেক সময় মাসভিত্তিক উৎপাদন ৪০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। বর্তমানে ২১০ মেগাওয়াটের এই কেন্দ্রটি থেকে সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছিল না, যা এখন গ্যাস সংকটের কারণে সম্পূর্ণ শূন্যে নেমেছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ময়মনসিংহ শহরের পাশাপাশি পুরো বিভাগের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগ নগরে তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের দাবি করলেও বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও করুণ; সেখানে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। এতে তীব্র গরমে শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন এবং খামারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
একই সঙ্গে বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ ও লাইনের গ্যাসের দ্বিমুখী সংকটে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। নগরীর কাঁচিঝুলি এলাকার বাসিন্দা ও নারী উদ্যোক্তা শেফালী আক্তার হতাশা প্রকাশ করে জানান, দিন ও রাতে সমানতালে চার-পাঁচবার করে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিবারই এক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না। এর সাথে বাসায় গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না ও দৈনন্দিন কাজ করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম রাশেদ জানান, জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহের জটিলতার কারণে জাতীয় পর্যায়ে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই কেন্দ্রে। তবে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ময়মনসিংহ পাওয়ার স্টেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাদ মুহা. সাবের বলেন, পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্যাস সাপ্লাই পাই তিতাস থেকে, তাহলে আমরা খুব দ্রুত পূর্ণক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারবো। আর পূর্ণক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আমাদের ৪২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাপ্লাই দরকার।
ময়মনসিংহ বিভাগের চারজেলাসহ টাঙ্গাইল পর্যন্ত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ায় ময়মনসিংহ অঞ্চলে ব্যাপকহারে লোডশেডিং বেড়েছে বলে জানান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ময়মনসিংহ আঞ্চলিক অফিসের কেউ কথা না বললেও প্রধান ফটকের সামনে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে প্রেস বিজ্ঞপ্তির ব্যানার টানিয়ে রেখেছে তিতাস কর্তৃপক্ষ।
সময়ের আলো/আতা