পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ছবি : সময়ের আলো স্কুল আছে। শিক্ষক-স্টাফ আছেন ১২ জন। কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীও আছে শতাধিক। কিন্তু বাস্তবে বিদ্যালয়ে নেই একজন শিক্ষার্থীও। শিক্ষার্থীদের যে শ্রেণিকক্ষে বসে পড়াশোনা করার কথা, সেখানে নিয়মিত বসে ছাগল। শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চে ছাগলের মলমূত্র। রয়েছে কাদামাটি, ময়লা-আবর্জনা ও মাকড়সার জাল। এমন চিত্র দেখা গেছে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের বাদুরতলা গ্রামের পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। শিক্ষক-স্টাফরা প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা বেতন উত্তোলন করেন। এ বিদ্যালয়ে সরকারের লাখ লাখ টাকা অযথা ব্যয় হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বিদ্যালয়টি তালাবদ্ধ। অফিস কক্ষেও ঝুলছে তালা। বাইরে টাঙানো রয়েছে জাতীয় পতাকা। শ্রেণিকক্ষগুলোর পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন। শিক্ষার্থীদের বসার বেঞ্চগুলো এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। বেঞ্চে জমে আছে কাদা ও ময়লা। শ্রেণিকক্ষের বিভিন্ন স্থানে মাকড়সা জাল বুনে রেখেছে। শ্রেণিকক্ষে ছাগলের অবাধ বিচরণ চোখে পড়ে। যেন শ্রেণিকক্ষ হয়ে উঠেছে ছাগলের আশ্রয়স্থল। শ্রেণিকক্ষের হোয়াইট বোর্ডে ২০২৪ ও ২০২৫ সাল লেখা রয়েছে। এতে ধারণা করা যায়, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের কোনো একসময় বোর্ডে লেখা হয়েছিল। এরপর সেখানে পাঠদান হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ বছর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস নেওয়া হয়নি বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।
বেলা ১১টার পর বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন সহকারী শিক্ষক অনামিকা মৃর্ত ও রতন লাল মিস্ত্রি। এত দেরিতে বিদ্যালয়ে আসার কারণ জানতে চাইলে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এরপর তারা তড়িঘড়ি করে প্রধান শিক্ষকসহ বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের ফোন করেন। সাংবাদিক বিদ্যালয়ে এসেছেন জানিয়ে তাদের বিদ্যালয়ে আসতে বলেন। বেলা ১২টার দিকে বিদ্যালয়ে আসেন প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও সহকারী শিক্ষক মো. হাসান মৃধা। বাকি শিক্ষক-কর্মচারীদের কাউকেই তখনও বিদ্যালয়ে দেখা যায়নি। পরে অফিস কক্ষে গিয়ে শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে পারেননি। একপর্যায়ে তারা জানান, হাজিরা খাতা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের ঘরে রাখা আছে। এরপর সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান তারা। একপর্যায়ে সহকারী শিক্ষক মো. হাসান মৃধাকে দিয়ে প্রধান শিক্ষক এই প্রতিবেদককে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এমন দশা আজকের নয়। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বিদ্যালয়টি চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। স্থানীয় কোনো শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয়ে পড়তে আসে না। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবু বিভিন্ন এলাকার যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে না, তাদের টাকার বিনিময়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি দেখান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে অডিট আসলে কিংবা কোনো প্রোগ্রাম হলে মাঝেমধ্যে ঝালকাঠি সদরের বিভিন্ন এলাকা থেকে দুইটি অটোরিকশায় করে টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থী এনে দেখানো হয়। এমনকি বিদ্যালয়ের পরীক্ষার সময়ও মাঝে মধ্যে বাইরে থেকে ছেলে-মেয়ে এনে তাদের শিক্ষার্থী হিসেবে দেখানো হয়। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবুর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তার পরিবারের পাঁচজন সদস্য বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে কর্মরত রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবু এবং প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু তাদের পছন্দের লোকজন দিয়ে বিদ্যালয়ের কমিটি গঠন করেন। বর্তমানে বিদ্যালয়ের সভাপতি পদে রয়েছেন প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর বড় ভাই মনিরুজ্জামানের ছেলে মিজানুর রহমান পারভেজ। অর্থাৎ প্রধান শিক্ষক নিজের ভাইয়ের ছেলেকে সভাপতি বানিয়েছেন। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সভাপতি নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এসে বাসায় বসেই স্বাক্ষর করেন। প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে।
রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তাকে পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি করা হয়। তখন বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী ছিল না। ক্লাসও হতো না। কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে কোনো শিক্ষার্থী পাওয়া যেত না। তিনি বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমেও চেষ্টা করেন।
বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি মো. মিজানুর রহমান ওরফে পারভেজ বলেন, আপনার কাছে বলতে আমি বাধ্য না। আপনি আমার কাছে না বলে কেন স্কুলে গিয়েছেন? স্কুলে শিক্ষকরা আসে বা ক্লাস হয় নাকি আপনি গিয়ে স্কুলে বসে থাকেন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক বেতনের শিটে টাকার বিনিময়ে স্বাক্ষর করেন—এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনার কাছে বলতে আমি বাধ্য না, আমার ডিসি আছে, শিক্ষা অফিসার আছে, তাদের কাছে বলব।
পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী না এলেও কাগজে-কলমে ১১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। মাঝে মধ্যে ঝালকাঠি শহর থেকে দুইটি অটোরিকশায় শিক্ষার্থী এনে বিদ্যালয়ে ক্লাস করানো হয়।
রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, বিদ্যালয়ের বিষয়টি জানতে পেরে প্রধান শিক্ষককে লিখিত জবাব চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহ তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এরপর পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে এবং প্রধান শিক্ষকের দেওয়া জবাব সন্তোষজনক না হলে পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা মৌরি বলেন, বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/এনএন