গ্যাস সংকটের মধ্যে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।
পোস্টে তিনি বলেন, ‘গ্যাস সংকটকে কাজে লাগিয়ে সাগরে তৃতীয় টার্মিনাল স্থাপন করে মুশফিকুর রহমান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪) এমপির নাতির পকেট ভারী করা হচ্ছে কী? দেশের মানুষকে সংকটে ফেলে, মানুষের কষ্টের টাকায় পকেট ভারী হয় মন্ত্রী-এমপিদের ছেলেদের, নাতিদের। সবার আগে বাংলাদেশ না, সবার আগে মন্ত্রী-এমপির পরিবার।’
এতে তিনি বলেন, ‘আজকে সংবাদ প্রকাশি হয়েছে, আগের দুটি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) চেয়ে ৩৭ শতাংশ বেশি খরচ দিয়ে তৃতীয় টার্মিনালের কাজ দিতে যাচ্ছে সরকার। বর্তমানে এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ বাবদ দৈনিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের জন্য ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার খরচ হয়। কিন্তু তৃতীয় যে টার্মিনাল চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই) স্থাপন করবে, তাদেরকে দিনে ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। (কমেন্ট বক্সে রেফারেন্স) অথচ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল) ২০২৫ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দৈনিক ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলার সুপারিশ করেছিল। সিএনইই দৈনিক এর চেয়ে ৪৩ শতাংশ বেশি ডলার চাইছে।’
‘‘অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ২৮ জুলাই নীতিগতভাবে CNEE এর প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ‘তারা বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি সরবরাহ করতে আগ্রহী।’ যদিও পেট্রোবাংলার ৭ সদস্যের সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটি ৩০ আগস্ট সরকারের কাছে দুটি বিকল্প সুপারিশ করে: দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলারে ১৫ বছরের চুক্তি অথবা দৈনিক ৩ লাখ ২৯ হাজার ডলারে ২০ বছরের চুক্তি।’’
তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন হচ্ছে, এই চীনা কোম্পানির পেছনে কে? কেনো তাদের জন্য সরকার এত উদার? কাগজে কলমে একটি চীনা কোম্পানি প্রকল্প পেলেও, তাদের প্রস্তাবনা পড়লে দেখা যায় ভিন্ন তথ্য। গত ১২ মে NS Energy নামের কোম্পানি জ্বালানি মন্ত্রনালয়কে তৃতীয় টার্মিনালটি স্থাপনের প্রস্তাব করে। এই কোম্পানির সিইও অর্থ মন্ত্রনালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪) এর নাতি তারিফ রহমান। তিনি এমপি মহোদয়ের মেয়ে মেহভীন রহমান মুনিয়ার ছেলে। তাঁর বাবা আশফাক জামিল রহমান NS Energy এর আসল মালিক বলে গুঞ্জন রয়েছে।
গত ১৯ জুন চীনা কোম্পানি CNEE টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তাদের প্রস্তাব আর এমপির নাতির কোম্পানির প্রস্তাব পাশাপাশি নিয়ে দেখা যায় হুবহু এক। ছয় পৃষ্ঠার চিঠিতে কেবল কোম্পানির নাম ছাড়া কোনো শব্দ, কোনো সংখ্যাই পরিবর্তন করা হয় নি। এমনকি চীনা কোম্পানির দেয়া ম্যাপের ছবিতে লেখা NS Energy। চীনা কোম্পানির প্রস্তাবিত এফএসআরইউর নাম কেনো NS Energy FSRU?’
‘দরপত্র এড়িয়ে সরকার-টু-সরকার (G2G) পদ্ধতিতে ২৮ জুলাই মন্ত্রিসভা কমিটি এই চীনা কোম্পানিকেই নীতিগত অনুমোদন দেয়। অর্থাৎ, বোঝা যাচ্ছে এমপির নাতির নাম ঢাকতেই নিজের নামে না করে চীনা কোম্পানিকে দিয়ে কাজটি করানো হচ্ছে। নয়ত পুরো প্রস্তাবনার প্রতিটা শব্দ হুবহু এক হওয়া সম্ভব নয়।’
`ধারণ করা যায়, মন্ত্রী সালাহউদ্দিন বা প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের পুত্রদের অবস্থা থেকে শিক্ষা নিয়ে এভাবে লুকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। নতুবা চীনা কোম্পানি হুবুহু একই ডকুমেন্ট পেলো কোথায়?'
সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মুশফিকুর রহমান বলেছেন, তিনি NS Energy Navigation ও CNEE-র মধ্যে কোনো সম্পর্কের কথা জানেন না। জানতে পারেন শুধু তার জামাতা। কিন্তু প্রশ্নটা এমপি ব্যক্তিগতভাবে জানা নিয়ে নয়। প্রশ্নটা হলো, অর্থ মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহিতা আদায় করে স্থায়ী কমিটি। অর্থমন্ত্রীরও জবাবদিহিতা আদায় করে। অর্থমন্ত্রী আবার অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির আহ্বায়ক। তিনি যে সভাপতির কমিটির কাছে জবাবহিদিতা করেন, তার নাতি যদি নামে বেনামে সরকারি কন্ট্রাক্ট পায়, তাহলে জবাবদিহিতা আর থাকে কোথায়?
দ্বিতীয় অর্থ-সংক্রান্ত জবাবদিহিতা তদারকির দায়িত্বে থাকা একজন সংসদ সদস্যের পরিবারের মালিকানাধীন কোম্পানির গোপনীয় প্রযুক্তিগত নথি একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলো কীভাবে? সেই প্রতিষ্ঠানই পরবর্তীতে সেই একই প্রকল্পে ৩৭% বেশি দামে সরকারের অনুমোদন পেলো কীভাবে? একই প্রস্তাব এক মাস আগে দিয়ে NS Energy কেনো এই কাজ পেলো না?
এই কেলেঙ্কারি এখানেই থামেনি। CNEE তাদের কারিগরি যোগ্যতা প্রমাণের জন্য দাবি করেছিল, সামিট টার্মিনাল-২ এফএসআরইউ প্রকল্পে অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সরাসরি তা অস্বীকার করেছেন। জানিয়েছেন প্রস্তাবিত সামিট টার্মিনাল-২ প্রকল্পে বা বিদ্যমান সামিট এফএসআরইউতে CNEE-র সঙ্গে তাদের কোনো চুক্তি নেই।
অর্থাৎ যে কোম্পানিকে সরকার তৃতীয় টার্মিনালের কাজ দিতে যাচ্ছে, তাদের অভিজ্ঞতা নেই। অথচ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব দাবি করেছেন, মূল্যায়ন ইতিমধ্যে সম্পন্ন। কী ছিল সেই মূল্যায়নে, কীভাবে একটি ভুয়া অভিজ্ঞতার দাবি পার পেয়ে গেল যাচাই প্রক্রিয়ায়; তার কোনো জবাব মেলেনি।
এভাবেই দেশের মানুষকে সংকটে ফেলে, মানুষের কষ্টের টাকায় পকেট ভরবে মন্ত্রী-এমপিদের ছেলেদের, নাতিদের। সবার আগে বাংলাদেশ না, সবার আগে মন্ত্রী-এমপির পরিবার।