বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক মর্যাদা নির্ধারণে শুধু শিক্ষার মান নয়, গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা, স্নাতকদের কর্মক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা এবং বৈশ্বিক সংযোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব সূচক বিবেচনায় বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকা প্রকাশ করে কিউএস।
২০২৭ সালের কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংসে ১ হাজার ৫০০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। একাডেমিক সুনাম, গবেষণা, কর্মসংস্থান, শিক্ষার পরিবেশ, আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ও টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে এ তালিকা।
শীর্ষ দশে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের বিশ্ববিদ্যালয়। চলুন দেখে নেওয়া যাক তালিকার সেরা ১০ বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের বিশেষত্ব।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি), যুক্তরাষ্ট্র
কিউএস র্যাংকিংয়ে এবারও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটি। এ নিয়ে টানা ১৫তমবারের মতো বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ম্যাসাচুসেটসের কেমব্রিজে অবস্থিত এমআইটি বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিশিক্ষায় বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত বহু শিক্ষার্থী ও গবেষক নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও এমআইটির রয়েছে ব্যাপক খ্যাতি। একাডেমিক জগৎ থেকে শুরু করে চাকরির বাজার—দুই ক্ষেত্রেই এর স্নাতকদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, যুক্তরাজ্য
কিউএস র্যাংকিংয়ে যৌথভাবে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা ও ব্যবসায় শিক্ষায় বিশেষ সুনাম রয়েছে লন্ডনের এ প্রতিষ্ঠানটির।
গবেষণাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ইম্পেরিয়ালের অন্যতম শক্তি। প্রতিষ্ঠানটির স্নাতকদের যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিয়োগদাতাদের কাছে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি। ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
সিলিকন ভ্যালির কাছাকাছি অবস্থান স্ট্যানফোর্ডকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের অনুকূল পরিবেশ দিয়েছে। প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও প্রতিষ্ঠানটির বড় সম্পদ। নতুন ধারণাকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দেওয়ার সংস্কৃতির জন্য পরিচিত স্ট্যানফোর্ডের সাবেক শিক্ষার্থী ও গবেষকদের অনেকে প্রযুক্তি ও ব্যবসাজগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড, যুক্তরাজ্য
বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড রয়েছে চতুর্থ অবস্থানে। দীর্ঘ একাডেমিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিক গবেষণাতেও প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান শক্তিশালী।
মানবিক, বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অক্সফোর্ডের রয়েছে ব্যাপক সুনাম। বিশ্বের ১৬০টির বেশি দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসেন। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি বিতর্ক, গবেষণা ও স্বাধীন চিন্তার চর্চার সুযোগও শিক্ষার্থীদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি রয়েছে কিউএসের ২০২৭ সালের তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে।
ম্যাসাচুসেটসের কেমব্রিজে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি একাডেমিক সুনাম, গবেষণা এবং প্রভাবশালী সাবেক শিক্ষার্থীদের কারণে বিশেষভাবে পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা নানা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য হার্ভার্ডে আসেন।
ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ, যুক্তরাজ্য
শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ। ৮০০ বছরের বেশি পুরোনো এই প্রতিষ্ঠান একাডেমিক উৎকর্ষ ও গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাত।
কেমব্রিজ থেকে বহু খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, রাজনৈতিক নেতা ও নোবেলজয়ী বের হয়েছেন। এর বিভিন্ন কলেজ, গবেষণাকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক কার্যক্রম প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করেছে।
ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ক্যালটেক), যুক্তরাষ্ট্র
শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও গবেষণায় ক্যালটেকের প্রভাব ব্যাপক। কিউএস র্যাংকিংয়ে সপ্তম স্থানে থাকা এ প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞান ও প্রকৌশল গবেষণার জন্য বিশ্বখ্যাত।
ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় অবস্থিত ক্যালটেক কোয়ান্টাম বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে। নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
ক্যালটেকের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট গবেষকদের অর্জনের তালিকায় রয়েছে ৪৯টি নোবেল পুরস্কার। সীমিত পরিসরে থেকে বড় ধরনের গবেষণা পরিচালনাই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ইটিএইচ জুরিখ, সুইজারল্যান্ড
সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখ কিউএস র্যাংকিংয়ে অষ্টম স্থানে রয়েছে। ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে এটিই সর্বোচ্চ র্যাংকধারী বিশ্ববিদ্যালয়।
জুরিখে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিশিক্ষার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির পাশাপাশি গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এর সুনাম রয়েছে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল), যুক্তরাজ্য
ইটিএইচ জুরিখের সঙ্গে যৌথভাবে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন বা ইউসিএল। গবেষণাভিত্তিক এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত।
১৮২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউসিএল ছিল লন্ডনের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায় দুই শতাব্দীর পথ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় বহুবিষয়ক গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসা, প্রকৌশল, স্থাপত্য, সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রয়েছে এর শক্তিশালী অবস্থান। বাস্তব বিশ্বের সমস্যার সমাধানে গবেষণার প্রয়োগেও গুরুত্ব দেয় ইউসিএল।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর (এনইউএস), সিঙ্গাপুর
কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংস ২০২৭-এ দশম স্থানে রয়েছে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর বা এনইউএস। শীর্ষ দশে জায়গা পাওয়া এশিয়ার একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় এটি।
এশীয় দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বৈশ্বিক শিক্ষার সমন্বয় এনইউএসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, ব্যবসা ও সামাজিক বিজ্ঞানে এর শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালী।
উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরিতেও বিশ্ববিদ্যালয়টির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। এনইউএসের উদ্যোগ ও সহযোগিতায় ২০১১ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে ১ হাজার ৬০০টির বেশি স্টার্টআপ সহায়তা পেয়েছে। ফলে এশিয়ার শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্যোক্তা পরিবেশে প্রতিষ্ঠানটির প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
সময়ের আলো/জেডি